একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বিদ্যমান বহুমুখী সম্পর্ককে আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় এ আহ্বান জানান। সফরটিকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে উভয় নেতা সামাজিক উন্নয়ন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং একটি শান্তি পূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ার যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল এই আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য দৃশ্যমান সুযোগ ও সুফলে রূপান্তর করা।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফর চলার কথা রয়েছে। গতকাল জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং জাপানি বৈদেশিক বিনিয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ এবং বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান জানান, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের অধীন পাঁচ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে জাপানের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশে অন্তত দুই লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সুফল ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিপুল বিনিয়োগ দেশের শিল্প খাতকে গতিশীল করবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে যৌথ অগ্রগতির অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস প্রস্তুতকরণ ও উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে দেশে একটি বিশেষ ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দেশের পরিবহনব্যবস্থা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে ঢাকা ও প্রধান শহরগুলোর সংযোগ ত্বরান্বিত করার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। যৌথ উদ্যোগে মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহায়তার পাশাপাশি ছয়টি বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করতে দ্রুতগতির রেল সংযোগ এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে জাপানের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে ইতিবাচক কথা হয়েছে।
উভয় দেশ যৌথ সমৃদ্ধির একটি নতুন রূপরেখার আওতায় বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করতে একমত পোষণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক সংযোগব্যবস্থা, শিল্প পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের সমন্বিত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা শক্তিশালী হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন ও একটি মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাবও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় জাপানের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তার কথা স্মরণ করে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাপান সফরের মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টোকিও শুরু থেকেই ঢাকার একটি পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী। নতুন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর তাঁর সরকার বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, পরিকাঠামো সংস্কার ও নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে গতিশীল অর্থনীতি গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি, জাপান সরকার এবং সেখানকার জনগণের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
Leave a Reply