বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৫ অপরাহ্ন

স্কুল-কলেজে এগিয়ে মেয়েরা, উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে পিছিয়ে কেন?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ সময় দেখুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে শিক্ষার্থীদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে আছে। তবে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের স্তরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই চিত্রটি বিপরীতমুখী হয়ে যায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ দশমিক ২ শতাংশই মেয়ে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কলেজ পর্যায়েও মেয়েদের অংশগ্রহণ ৫২ শতাংশের কাছাকাছি। স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রী ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক কলেজে এই হার ৫৩ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান, গবেষণায় বরাদ্দ সর্বোচ্চ ২ লাখ। শিক্ষায় বৈষম্য বেড়েই চলছে, কোচিং-প্রাইভেট বাড়ছে, সঙ্গে ব্যয়ও। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, আগের তুলনায় শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। শূন্য পদ প্রায় সোয়া ৫ লাখ। পরবর্তী সময়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ আরও বেড়েছে; কিন্তু উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোতে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ব্যানবেইস।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তথ্যমতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর বাইরে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের হার ৪০ শতাংশের নিচে। ব্যানবেইস-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট ১১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর হার মাত্র ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ প্রায় ৪২ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ হার ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) আওতায় ২০১৫ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাগত সমতা অর্জন করেছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার পেছনে কোন কারণ কতটা দায়ী, তা বিশদ গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৪২ শতাংশ।

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই চিত্রের ভিন্নতা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪২ শতাংশ ছাত্রী থাকলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার ৪৯ শতাংশ। কিছু ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেশ আশাব্যঞ্জক, যেমন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৫০ শতাংশের বেশি।

উচ্চশিক্ষার এই বৈষম্যের পেছনে পারিবারিক সচেতনতার অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থার সংকট বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ির বাইরে থাকা বা বিয়ের মতো সামাজিক বিষয়গুলো অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন সংকুচিত করে দিচ্ছে। চাকরির ক্ষেত্রেও বিশেষ করে বদলিযোগ্য কর্মস্থল, দূরবর্তী এলাকায় পদায়ন, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলানোর মতো বিষয় নারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্রের এই অগ্রগতির ধারা কর্মজীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে না। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান-২০২৫’ অনুযায়ী, সরকারি চাকরির মোট ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে নারী ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন, যা মোট জনবলের মাত্র ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষের অংশ ৭১ শতাংশেরও বেশি। শুধু তা-ই নয়, পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরিতেও নারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে নয়, এখনো তা ৩০ শতাংশের কম। আবার সরকারি চাকরিতে নারীর কম প্রতিনিধিত্বের কারণ শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা বদলির নীতিতে সীমাবদ্ধ—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন এবং নারী ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন।

সরকারি চাকরির উচ্চপদগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও কম। গ্রেড-১ পদে কর্মরত ১ হাজার ১০৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র ১৬২ জন বা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪৬ হাজার ৯২৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও এই পরিসংখ্যানের বাইরে বেসরকারি খাতে এবং তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক নারী কর্মরত রয়েছেন।

এই পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত মেয়েদের এগিয়ে নিতে হলে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনা, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবার ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে নারীরা দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনে টিকে থাকতে পারেন।

পরিশেষে, স্কুল-কলেজে মেয়েদের যে সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ধরে রাখতে হলে কাঠামোগত বাধাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। উচ্চশিক্ষার পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব নীতি কার্যকর করাই হতে পারে এই বৈষম্য কমানোর মূল চাবিকাঠি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর