রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ অপরাহ্ন

কুষ্টিয়ায় লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুরু

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ সময় দেখুন

মরমি সাধক ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হয়েছে তিন দিনের বর্ণিল স্মরণোৎসব। গতকাল শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন ঘিরে আখড়াবাড়িতে দেশ-বিদেশ থেকে সমবেত হয়েছেন অগণিত সাধু-গুরু, বাউল-ফকির ও ভক্তবৃন্দ। জাত-ধর্মের সকল বিভেদ ভুলে একতারা, দোতারা ও ঢোলের ছন্দে তারা লালনের মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুর ছড়িয়ে দিচ্ছেন চারদিকে। কেউ একতারা হাতে সুর তুলছেন, কেউ দোতারায় বাঁধছেন ছন্দ। লালন শাহের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ।

আখড়াবাড়িতে বাউলগানের আসর, গভীর সাধুসঙ্গ ও নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। উৎসবের জৌলুশ ছাপিয়ে প্রতিটি আয়োজনে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে লালনের সেই চিরন্তন দর্শন, যেখানে মানুষের পরিচয়ই সর্বপ্রধান। ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকেই তিনি সবসময় বড় করে দেখেছেন। গানের সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়ছে মানবতা, সম্প্রীতি আর মানুষকে ভালোবাসার চিরন্তন বার্তা। তার গান ও সাধনায় বারবার উঠে এসেছে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচলিত সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্ন করার সাহস। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জাতিগত বিভেদের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। গানের আসর ও সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করছেন তারা।

গতকাল বিকেল থেকেই আখড়াবাড়িতে ভক্তদের ভিড় বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বাউলদের কণ্ঠে ভেসে আসে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’ কিংবা ‘মিলন হবে কত দিনে’-এর মতো কালজয়ী সব গান। ভক্তরা তন্ময় হয়ে গানের আসরে মগ্ন হয়েছেন, আবার কেউ কেউ মুঠোফোনে এই সুরের মূর্ছনা ধারণ করেছেন। এই পরিবেশ যেন অনেকের কাছেই আত্মশুদ্ধি ও লালনের দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক নিবিড় সুযোগ।

ফকির লালন শাহের দর্শন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সমাজে যখন অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের বেড়াজাল বাড়ছে, তখন তার মানবতাবাদী চিন্তা মানুষকে নতুন করে পথ দেখাচ্ছে। লালনভক্তদের মতে, তার গান মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধুরা ছেঁউড়িয়ার এই আঙিনাকে কেবল একটি স্থান নয়, বরং তাদের সাধনা ও আত্মিক সংযোগের মিলনক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। বছরের এই বিশেষ সময়ে তারা গুরুর স্মরণে মিলিত হন এবং নিজেদের ভাবজগৎকে সমৃদ্ধ করেন। আখড়াবাড়ির পাশাপাশি কালীগঙ্গা নদীর পাড়জুড়েও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর তীরে স্থানীয়দের নানা আয়োজন ও ব্যস্ততায় পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।

মেলা প্রাঙ্গণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অস্থায়ী দোকান সাজিয়ে বসেছেন, যেখানে নানা ধরনের খাবার, খেলনা ও প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। আখড়াবাড়ির আধ্যাত্মিক পরিবেশের পাশাপাশি এই মেলা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছে। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা; তারা লালনের দর্শন সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে উঠছে এবং তাদের উপস্থিতিতে এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মনে করছেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা।

অনেকের মতে, লালনকে কেবল এই তিন দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার দর্শনকে গবেষণা ও পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে নিয়মিত চর্চায় আনা জরুরি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে এবং সামাজিক বিভেদ দূর করতে লালন শাহের রেখে যাওয়া মানবতাবাদী শিক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। আজীবন সাধনা, মানবপ্রেম ও সত্যের সন্ধানে ব্রতী এই সাধকের স্মৃতিতে ছেঁউড়িয়ায় প্রতি বছর গড়ে ওঠা এই মিলনমেলা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রতি মানুষের টানেই পৃথিবীর সব বিভেদ মুছে ফেলা সম্ভব।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর