বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ন

কুড়িগ্রামে মিলল বিরল সিঁদুরে মৌটুসি পাখির দেখা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৬ সময় দেখুন

বাংলাদেশে বিদ্যমান মৌটুসি পাখির প্রজাতিগুলোর মধ্যে সিঁদুরে মৌটুসি নিঃসন্দেহে অন্যতম সুন্দর। গভীর বনের এই পাখি সচরাচর সাতছড়ি উদ্যান, সুন্দরবন কিংবা চট্টগ্রামের হাজারিখিলের মতো বনাঞ্চলে দেখা যায়। তবে অবাক করার বিষয় হলো, উত্তরাঞ্চলের জনপদেও এখন এই পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কেবল ছবির মাধ্যমেই এই পাখির পরিচিতি ছিল, তবে বাস্তবে একে দেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। তাঁরা প্রত্যেকে আবারও জানান, তাঁদের জানামতে এই পাখি উত্তরাঞ্চলে দেখার রেকর্ড নেই। এসব শুনে রংপুরে এই পাখি খোঁজা ছেড়ে দিয়েছিলাম। খাওয়া ছেড়ে দ্রুত ক্যামেরা বের করে ছবি তুললাম। ভালো ছবি না পেলেও কুড়িগ্রামে এই পাখি দেখাটাই একটি বড় ঘটনা হয়ে থাকল। ছবি তুলতে তুলতে দেখি, রং ছড়িয়ে চলে এল সিঁদুরে মৌটুসি।

একসময় রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় এই পাখির সন্ধানে ঘুরেছেন পাখিপ্রেমীরা। অনেকেই দাবি করেছিলেন, মান্দার ফুলের মধুপ্রিয় এই পাখিটি উত্তরের কোনো এলাকায় দেখা যায় না। এসব তথ্যের কারণে দীর্ঘ সময় উত্তরের জনপদগুলোতে সিঁদুরে মৌটুসির অনুসন্ধান বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ২০২২ সালের এক শীতের সকালে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে নিজের বাড়ির আঙিনায় শিম ফুলের মধু খেতে প্রথমবার সিঁদুরে মৌটুসি নজরে আসে। এটি ছিল এক বিশাল চমক। কুড়িগ্রামের বাইরে উত্তরাঞ্চলের কোথাও এই পাখির নিয়মিত উপস্থিতির রেকর্ড না থাকায়, এটিকে অত্যন্ত বিরল বলেই গণ্য করা হয়। এ কারণে মান্দারের মৌসুম এলেই এই পাখির খোঁজ বেড়ে যেত। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় আমার গ্রামের বাড়ি। এ পাখি যে লিচুর রস খায়, এটি কোনো দিন শুনিনি, কারও ছবিতেও দেখিনি।

গভীর বনের এই পাখি কীভাবে লোকালয়ে এল, তা নিয়ে বিস্ময় থাকলেও পরবর্তীতে জানা যায় যে কুড়িগ্রাম সদর ও নাগেশ্বরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও এর বিচরণ রয়েছে। আলোকচিত্রী সঞ্জয় চৌধুরী নাগেশ্বরীতে এই পাখির ছবি তুলেছেন। পাখির এই উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লিচুর মৌসুমে এই পাখি বাড়ির গাছে এসে লিচুর রস পান করছে, যা ছিল முற்றிலும் নতুন এক তথ্য। ২০২৩ সালে লিচুর রসের সঙ্গে সিঁদুরে মৌটুসির দুর্লভ সব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া রাজারহাটের বৈদ্যেরবাজার এলাকায় মধুমঞ্জরী ও জবা ফুলের মধু সংগ্রহের সময়ও এদের দেখা মিলেছে। যেহেতু এই পাখি একবার দেখা গেছে, তাই যতবার বাড়িতে যাই, আমি এই পাখি খুঁজি। ফুলঝুরি, শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলি পাখি বারবার এসে লিচু খাচ্ছিল।

পাখিটি চেনার ক্ষেত্রে কিছু বিবর্তনীয় অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন পর্যবেক্ষক। ২০১৯ সালে গোলাপজাম ফুলে একটি স্ত্রী মৌটুসি পাখির ছবি তুলেছিলেন তিনি, কিন্তু তখন বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতার পর নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সেই ছবিটি মূলত একটি স্ত্রী সিঁদুরে মৌটুসির ছিল। পুরুষ পাখিটির তুলনায় স্ত্রী পাখিটি আকারে কিছুটা ছোট এবং কম উজ্জ্বল। তবে ২০২৪ সালে সুন্দরবন ও চট্টগ্রামের হাজারিখিলে পরগাছা ফুলের মধু সংগ্রহের সময় পাখিটিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়। যদিও সাতছড়িতে মান্দার ফুলের সঙ্গে এদের ছবি তোলার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে গেছে, তবুও লিচু ও গোলাপজাম ফুলের ওপর এদের বিচরণ দেখে মুগ্ধতা বেড়েছে। ২০২৪ সালে সুন্দরবনে খুব কাছে থেকে এই পাখি দেখেছি।

সিঁদুরে মৌটুসির (Crimson Sunbird) ইংরেজি নাম ও এর বৈজ্ঞানিক নাম Ayethopyga siparaja। পাখিটির মাথায়, গলায় এবং সংশ্লিষ্ট অংশে সিঁদুরের মতো টকটকে লাল রঙের আধিপত্য থাকে, কেবল কপাল ও চোখ কালো রঙের। চঞ্চুর গোড়া থেকে একটি কালো রেখা লাল রঙের ওপর দিয়ে গলার দিকে প্রসারিত। এদের চঞ্চু লাল আভার এবং মধু সংগ্রহের সুবিধার্থে জিহ্বা অত্যন্ত লম্বা। লাল রঙের অংশটুকু বাদ দিলে শরীরের বাকি অংশ মূলত ধূসর এবং আকৃতিগতভাবে অন্যান্য মৌটুসির চেয়ে এরা সামান্য বড় হয়।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর