বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ন

বলিউডে শুটিং সেটে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য পরিচালনায় থাকছেন সমন্বয়ক

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের উপস্থাপনা নিয়ে বরাবরই নানা বিতর্ক ও অস্বস্তি রয়েছে। অতীতে অনেক অভিনেত্রী শুটিং চলাকালীন সহ-অভিনেতার বাড়াবাড়ি বা অস্বস্তিকর আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে পশ্চিমা বিশ্বের মতো এখন ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পেও ‘ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর’ বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য সমন্বয়কের উপস্থিতি বাড়ছে। #মিটু আন্দোলনের পর অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা ও সম্মতির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘অন্তরঙ্গ দৃশ্য’—এই শব্দ দুটিই আলোচনার জন্য যথেষ্ট। সিনেমায় অন্তরঙ্গ দৃশ্য থাকলে কখনো সেন্সর নিয়ে ঝামেলা হয়, কখনো আবার মুক্তির পরে শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা। কলকাতার অভিনেত্রী পাওলি দাম অভিনীত শ্রীলঙ্কান সিনেমার ক্লিপ ফাঁস হওয়ার পর কী ঘটেছিল, তা নিশ্চয়ই অনেক সিনেমাপ্রেমীর মনে আছে। অনেক অভিনেত্রী এ ধরনের দৃশ্য নিয়ে অস্বস্তির কথা জানিয়ে কেউ অভিযোগ করেছেন, শুটিংয়ে সহ–অভিনেতার বাড়াবাড়ির কথা। বদলাচ্ছে পরিস্থিতি ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পে নগ্নতা কিংবা যৌনদৃশ্যের শুটিংয়ে এত দিন অনেকটাই নির্ভর করা হতো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। পরিচিত এই পেশার নাম ‘ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর’। একসময় বলিউডে প্রায় অপরিচিত এই পেশার মানুষদের উপস্থিতি এখন ক্রমেই বাড়ছে। বিনোদনশিল্পে যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা তৈরি করেছিল #মিটু আন্দোলন। চুম্বন কিংবা যৌনসম্পর্কের দৃশ্য সরাসরি না দেখিয়ে প্রতীকীভাবে বোঝানো হতো।

একজন ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের প্রধান কাজ হলো স্টান্ট পরিচালকের মতো ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের খুঁটিনাটি পরিকল্পনা করা। চলচ্চিত্রশিল্পের বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তনটির প্রধান চালিকা শক্তি স্ট্রিমিং সেবাগুলো। তিনি বলেন, ‘যেভাবে একজন স্টান্ট পরিচালক মারামারির দৃশ্যের পরিকল্পনা করেন, তেমনি ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ক্ষেত্রেও আমরা ঠিক করে দিই—হাত কোথায় থাকবে, চুল কীভাবে থাকবে। এগুলোর সাহায্যে অভিনয়শিল্পীরা অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংস্পর্শ কমিয়ে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের অভিনয় করতে পারেন।

এই পেশাজীবীরা নির্দিষ্ট করে দেন যে অভিনয়শিল্পীদের হাত কোথায় থাকবে বা শারীরিক ভঙ্গি কেমন হবে।

আস্থা খান্নার মতো কো-অর্ডিনেটররা জানান, অভিনয়ের সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে তাঁরা আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রাখেন। সাধারণত অভিনয়ের চুক্তির আগেই কো-অর্ডিনেটরদের মাধ্যমে চিত্রনাট্যে থাকা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের বিষয়টি শিল্পীদের জানানো হয়, যাতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে সম্মতি দেওয়ার সুযোগ পান। আস্থা খান্না বলেন, ‘এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে কোনো অভিনেতা তাঁর সহ-অভিনেত্রীর সম্মতি ছাড়াই তাঁকে চুমু দিয়েছেন।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর বিস্তারে বর্তমানে গল্পের ধরনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। যৌনতা বা সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো এখন আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে পেশাদার সহায়তার চাহিদাও বেড়েছে। আস্থা খান্না জানান, তিনি শুটিংয়ে ‘মডেস্টি টুলস’ বা শালীনতা রক্ষার উপকরণ যেমন বিশেষ সুরক্ষাবস্তু, স্তনবৃন্ত ঢাকার প্যাচ ও গোলাকার কুশন ব্যবহার করেন। এসব উপকরণের মাধ্যমে অভিনয়শিল্পীদের শরীরের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়, যা পারস্পরিক বিশ্বাস ও সুরক্ষার অভাব দূর করতে সহায়তা করে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে গল্প বলার ধরনে এসেছে সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্য।

মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে পেশাগতভাবে ইনটিমেসি ডিরেকশন চালুর অন্যতম উদাহরণ হলো ২০২২ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পাওয়া ‘গেহরাইয়াঁ’। নির্মাতা করণ জোহরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই ছবিতে আস্থা খান্না ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি নেহা ব্যাসো ইনটিমেসি কোচ হিসেবে শারীরিক সম্পর্কের গতিবিধি ও সম্মতির ওপর কর্মশালা পরিচালনা করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উন্মুক্ততাই এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।

জনপ্রিয় সিরিজ ‘মির্জাপুর’-এর অভিনয়শিল্পী রসিকা দুগ্গাল জানান, প্রথম দিকের মৌসুমগুলোতে তাদের নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী সীমারেখা সামলাতে হতো। এখন পেশাদার সমন্বয়ক থাকায় অস্বস্তি কমেছে এবং সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকিও দূর হয়েছে। নেহা ব্যাসো মনে করেন, বর্তমানে সেন্সরশিপের কড়াকড়ি কম থাকায় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করার আগ্রহ বেড়েছে, তবে এর জন্য পেশাদার তত্ত্বাবধান অত্যন্ত জরুরি।

ভারতে এই পেশাজীবীদের সংখ্যা এখনো খুব বেশি নয়, পুরো চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প মিলিয়ে এই সংখ্যা মাত্র এক ডজনের কাছাকাছি। তবে বড় বাণিজ্যিক ঘরানার অনেক ছবিতে এখনো কোনো কো-অর্ডিনেটর ছাড়াই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে, কারণ অনেকে পর্দায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় অংশ নিতে আগ্রহী নন। এছাড়া কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা বাধ্যবাধকতা না থাকায় চলচ্চিত্র সংগঠনগুলো এখনো অভিন্ন মানদণ্ড তৈরিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেনি। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতারা শুটিংয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণে আগ্রহী হয়েছেন। এর পেছনে ছিল সরকারের কঠোর নির্দেশিকা এবং ক্ষমতাধর সেন্সর কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ।

আস্থা খান্নার মতে, ঘনিষ্ঠ দৃশ্য মানেই কেবল রোমান্টিক বা উত্তেজক কিছু নয়; এর পরিসর অনেক বিস্তৃত। এতে আধিপত্য বিস্তার, সহিংসতা, হয়রানি বা নগ্নতার মতো গভীর বিষয়ও থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার কাজ এমন পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করে, যার মধ্য দিয়ে গেলে একজন মানুষকে হয়তো কয়েক বছর ধরে থেরাপি নিতে হতে পারে, অথচ সেই ক্ষত কখনোই পুরোপুরি শুকাবে না।’ এভাবে পেশাদারদের মাধ্যমে কাজ করলে অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা করা সহজ হয় এবং শুটিংয়ের পরিবেশও পেশাদার থাকে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর