মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ অপরাহ্ন

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

সৌদি আরবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, কফিনের ছবি ও নানা ভুল তথ্য ভাইরাল হতে শুরু করেছে। এতে একটি সচিত্র ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে যে তা সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের শিরশ্ছেদের চিত্র। তবে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, প্রচারিত ভিডিওটি সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নয়, বরং এটি প্রায় ৯ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৫ সালে সৌদি আরবে এক মিয়ানমারের নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি পুরোনো ফুটেজ। এর সঙ্গে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদমাধ্যমের অনলাইন পেজে বিমানবন্দরে কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যে মা–বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর বিস্তারিত চিত্র

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, পথচারীদের রাস্তা পারাপার হওয়া জেব্রা ক্রসিংয়ের নিকটে কালো রঙের বোরকা পরা এক নারীকে ঘিরে আছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য। তাঁর মধ্যে একজন সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি হাতে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘেরাওয়ের মধ্যে কালো পোশাক পরা ওই নারীকে উচ্চস্বরে আরবি ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি হত্যা করিনি। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি হত্যা করিনি।’ তিনি আরও চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘হারাম। হারাম। হারাম। হারাম। আমি হত্যা করিনি…আমি তোমাদের ক্ষমা…’।

ভিডিওটির দৃশ্যধারনে দেখা যায়, সাদা পোশাক পরা ওই ব্যক্তি নারীকে মাটিতে শুইয়ে দেন। পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণের স্থানটি ছিল সড়ক সংলগ্ন এবং ঘটনাটি ঘটেছিল যেখানে, সেই ঘটনাস্থল পথচারীদের পারাপারের একটি চিহ্নের কাছে। পেছনের দিকে বেশ কিছুটা দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পরও ওই নারী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আকুতি জানিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমি করিনি।’ এরপর তাঁর শেষ করুণ চিৎকার শোনা যায় এবং সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তি বাঁকানো তলোয়ার দিয়ে তাঁর শাস্তি কার্যকর করেন। এই সংবেদনশীল দৃশ্যকেই সম্প্রতি সাজাপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাম্প্রতিক দৃশ্য দাবি করে ফেসবুকে শেয়ার দেওয়া হচ্ছে।

কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত তথ্য

উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) প্রতিবেদনে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। এই ঘটনার পরপরই পরদিন অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই প্রবাসীর মামলার যাবতীয় বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় দেশটির পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের হাতে এই কূটনৈতিক পত্রটি পুনরায় হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বৈঠক ও আরেকটি কূটনৈতিক পত্র দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জেদ্দায় অনুষ্ঠিত কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তুলে ধরেন যে, সৌদি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় ওই দুজন বাংলাদেশির নাম ধারাবাহিকভাবে থাকলেও চূড়ান্ত শাস্তির তথ্য কেন পূর্বাহ্নে প্রকাশ করা হয়নি বা উহ্য রাখা হলো।

নতুন করে দেওয়া কূটনৈতিক পত্রের বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির মামলার পুরো বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ার সময় নেওয়া বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ এবং দণ্ডিত হওয়ার পর তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ আদৌ পেয়েছিলেন কি না—তা গভীরভাবে জানার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার কর্মকর্তারা জেদ্দার আলোচনার সময় যত দ্রুত সম্ভব দণ্ডিত দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশকে হস্তান্তরের আহ্বান জানান।

এ সংক্রান্ত বৈঠকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে নিম্ন আদালত দুই আসামির দণ্ড দেন। পরে আপিল আদালতে ১৩ জন বিচারক নিয়ে গঠিত প্যানেল তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। সৌদি আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত রায় অনুসরণ করে নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গ্রেপ্তারের এক মাস পর পরিবার তাঁর আটকের খবর জানতে পারে।

ভিডিওর প্রকৃত সত্যতা ও ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ

আলোচিত ভিডিওর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ও স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে মূল তথ্য অনুসন্ধান করা হলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’ ও ‘ডেইলি মেইল’, ইসরায়েলের ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ এবং পাকিস্তানের সাময়িকী ‘ডন’-এ ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে এ সংক্রান্ত বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই সময়ের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই ভিডিওতে শিরশ্ছেদ হওয়া নারীর নাম লায়লা বিনতে আবদুল মুত্তালিব বাসিম। তিনি মূলত মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন এবং সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন। নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত।

সৌদি আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের আনীত অভিযোগ ছিল, ওই নারী তাঁর স্বামীর ছয় বছর বয়সী শিশু কন্যাকে চরম নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের পর নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। এই অপরাধে সেদেশের উচ্চ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয়। সুতরাং, ২০১৫ সালের মিয়ানমারের নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরোনো ঘটনাকে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির দণ্ড কার্যকরের ভুয়া দাবি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। ওই নারী নিজের সৎকন্যাকে যৌন নিপীড়ন ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

মরদেহ দেশে ফেরা সংক্রান্ত অসত্য দাবির সত্যতা

ভিডিওর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজ ও আইডি থেকে কফিনের ছবি দিয়ে দাবি করা হচ্ছে যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। তবে এই দাবিটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অসত্য। প্রবাসীদের মরদেহ ফেরা বিষয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিষ্কারভাবে নিশ্চিত করেন, ‘লাশ এখনো আসেনি।’ বিষয়টি নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে যোগাযোগ করা হয়।

বাস্তবিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ভাইরাল হওয়া কফিনের ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে চলতি বছরের ৯ মে প্রকাশিত ‘সৌদি আরবে নিহত মুরাদের মরদেহ ১৬ দিন পর নিজ বাড়িতে’ শিরোনামের একটি পুরানো সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বাসিন্দা প্রবাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মুরাদ শেখের মরদেহ দেশে আসার ছবি ছিল সেটি।

  • গত ৯ মে সকালে রাজবাড়ীর প্রবাসী মুরাদ শেখের মরদেহ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁর গ্রামে পৌঁছায়।
  • একই দিন বেলা ১১টায় স্থানীয় কবরস্থানে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
  • অর্থাৎ, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার ছবিকে মৃত্যুদণ্ড হওয়া প্রবাসীদের লাশ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পরিচয় ও সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটি গুঞ্জন ও ফটোকার্ড ছড়ানো হচ্ছে যে, সাজাপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ নাকি পরস্পরের স্বামী-স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁরা হানিমুন করতে গিয়ে ওমরাহ পালনের নামে সৌদি পাড়ি দিয়েছিলেন।

এই বিভ্রান্তিকর তথ্যের জবাবে নিহত নজরুল ইসলামের পিতা আবদুল বাছির জানান, ‘আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে, তা মিথ্যা। নজরুল সম্পূর্ণ অবিবাহিত ছিল। তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়েটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।’ পরিবারের তথ্যানুযায়ী, নজরুল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর জীবিকার তাগিদে মক্কায় যান এবং হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর