শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৬ অপরাহ্ন

পুলিশের জনআস্থা বাড়াতে কেন জরুরি কমিউনিটি পুলিশিং

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২২ সময় দেখুন

কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাটি কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম নয়, বরং এটি পেশাদার পুলিশিংকে আরও স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার একটি আধুনিক পদ্ধতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের একক ভূমিকার চেয়ে জনগণের সাথে পারস্পরিক অংশীদারত্ব অনেক বেশি কার্যকর। পুলিশ যখন জনগণের কথা শোনে এবং নিজের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, তখনই সমাজে আস্থার জায়গাটি তৈরি হয়। তবে কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য স্পষ্ট। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। পুলিশিং আর ‘মোরাল পুলিশিং’ কেন একসঙ্গে চলতে পারে না। অপরাধসংক্রান্ত তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকে তথ্য দিতে ভয় পান। তিশা–মুশতাক বিতর্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নীতি পুলিশিং। কুড়িগ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়ান।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল দর্শন হলো পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্বের দেয়াল ভেঙে ফেলা। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪২ ও ৪৪ ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নাগরিকদের সহযোগিতার যে আইনি কাঠামো দেওয়া আছে, সেটি মূলত পুলিশকে সহায়তা করার বিধান। তবে এই আইনের কোনো বিধান স্বেচ্ছাসেবক বা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সদস্যদের কাউকে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা প্রদান করেনি। এই আইনের ৪২ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনসম্মতভাবে অনুরোধ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তাকে সহায়তা করার বিধান রয়েছে। ৪৪ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধ, হুমকি কিংবা ভুক্তভোগী হওয়ার ঘটনা জানানোর সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো এলাকায় বারবার চুরি হলে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা করা, স্কুলপথ নিরাপদ করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিকল্পিত টহল বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকর করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশের প্রতি জনআস্থার ঘাটতি এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্যের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী কিংবা তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। এছাড়া পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর করতে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই কথাটি কে, কখন, কোন প্রেক্ষাপটে প্রথম বলেছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত ও সম্মতি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কমিটিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্যের কারণে নারী, তরুণ, ভাড়াটে, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বও পর্যাপ্ত থাকে না। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কার্যক্রমে জবাবদিহির ঘাটতি এবং সরকারি অর্থ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। পুলিশি সেবায় বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের ধারণা জন–আস্থা তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের নাম করে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার বা বেআইনি সালিস পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের লোগো ব্যবহার করে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র তৈরি বা পুলিশের ন্যায় ক্ষমতা চর্চার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো অবস্থাতেই পুলিশের আইনগত ক্ষমতা কোনো অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এ ধরনের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

একটি কার্যকর কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা গড়তে থানা ও বিট পর্যায়ের স্থানীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা বা ‘কমিউনিটি সেফটি প্ল্যান’ গ্রহণ করা উচিত।

এই পরিকল্পনায় পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন: নিয়মিত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ, মাসিক সভা, আলোচিত সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান, দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ এবং কার্যক্রমের যথাযথ মূল্যায়ন।

বিশেষ করে চুরি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা ও অনলাইন প্রতারণার মতো বিষয়গুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে কাজ করা সম্ভব। চুরি, মাদকসংক্রান্ত সমস্যা, হয়রানি, সড়কনিরাপত্তা, অনলাইন প্রতারণা ও সহিংসতার মতো পুনরাবৃত্ত সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

অপরাধ প্রতিরোধের পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় শুধু অভিযানের সংখ্যার দিকে নজর দিলে হবে না, বরং অপরাধের ধরন, স্থান ও কারণ বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় কমিটির প্রতিটি সদস্যকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যেখানে সব শ্রেণির মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারো ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মত বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা বৈষম্যমূলক ও অনৈতিক। তবে গুরুতর অপরাধের তদন্ত অবশ্যই আইনানুগ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হতে হবে।

পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং আচরণের পরিবর্তন ছাড়া জনসম্পৃক্ততা অর্জন অসম্ভব। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও পক্ষপাতহীন দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক। পুলিশকে জনরোষ থেকে বেরিয়ে এসে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে আস্থা ফেরাতে হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে জনগণের ধারণায় যে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে। তারা কেবল স্থানীয় তথ্য সরবরাহ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের সহায়তাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। এর বাইরে কোনো অর্থ আদায়, তদন্তে হস্তক্ষেপ বা প্রমাণ নষ্ট করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সাফল্য পরিমাপের সূচক হওয়া উচিত ভুক্তভোগীদের সন্তুষ্টি, অপরাধের হার হ্রাস এবং অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত সাড়া প্রদানের সক্ষমতা। স্রেফ সভা-সেমিনার বা পরিসংখ্যানের মধ্যে এই কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া যাবে না।

পরিশেষে, কার্যকর পুলিশিংয়ের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান ও অংশীদারত্ব। পুলিশ যখন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং জনগণ যখন আইন মেনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তখনই নিরাপদ সমাজ গঠন সম্ভব। এই অংশীদারত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর