বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

তারেক রহমানের জাপান সফর: ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২১ সময় দেখুন

একটি রাষ্ট্রীয় সফরের তাৎপর্য কেবল যৌথ ঘোষণা বা বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে তার ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি করে। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঠিক সেই ধরনের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করার এক বড় সুযোগ। ফলে এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে যৌথ বিবৃতির ভাষার চেয়ে বেশি বাস্তব সংস্কারের ওপর।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট গত তিন দশকের প্রচলিত বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে নতুন পথে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুকে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন ভূ-অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর কেবল একটি জলসীমা নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক নতুন সংযোগস্থলে পরিণত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার এবং পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে সেতু হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বাড়ছে, যা জাপানও অনুধাবন করছে। গত তিন দশকের বৈশ্বিকায়নের যুগ কার্যত পুনর্লিখিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাথে জাপানের সম্পর্কের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিটি বড় ধাপে জাপানের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। যমুনা বহুমুখী সেতু, ঢাকার মেট্রোরেল, যমুনা রেলসেতু কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল ভিত্তি। তবে আজকের আধুনিক বিশ্বে কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে একে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অনেক দেশ বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করলেও শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হতে পারেনি। বাংলাদেশ এখন সেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে যে, আমরা কেবল অবকাঠামোর বৃত্তে আটকে থাকব, নাকি বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটাব? ১৯৭২ সালে দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়নের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জাপানের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা দুই দেশের সম্পর্ককে আস্থার এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। ফলে বাংলাদেশকেও এখন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

জাপানি কোম্পানিগুলো এখন তাদের উৎপাদন কেন্দ্রের বৈচিত্র্য বাড়াতে আগ্রহী এবং তারা চীনের বাইরে বিকল্প খুঁজছে। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাতে সচেষ্ট। বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগের উপযোগী রাষ্ট্রিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। বিনিয়োগকারীরা কেবল অর্থের নিরাপত্তা নয়, বরং নীতির স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রত্যাশা করেন। অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগকারী জানতে চান নীতির স্থিতিশীলতা কতটা, প্রশাসনের কার্যকারিতা কতটুকু, অনুমোদন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং ব্যবসার পরিবেশ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য। জাপানি বিনিয়োগকারীরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি আস্থা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতাকে মূল্য দেন। জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা চীনের বিকল্প নয়, যেমন চীনের সঙ্গে সহযোগিতাও জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও এই সফরের গুরুত্ব অপরিসীম। মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে গভীর অংশীদারত্ব, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। একে ‘উন্নয়নকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ হিসেবে অভিহিত করা যায়, যেখানে কোনো শক্তি-বলয়ের অংশ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।

মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাপানি সহযোগিতাকে কাজে লাগানো সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় এক সময়ের পোশাক শিল্পে দক্ষ কর্মীদল তৈরির ইতিহাসই প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন অবকাঠামো নয়, বরং দক্ষ মানুষ। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি বন্দর, রেলপথ ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবে তা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে আবির্ভূত হবে। তারেক রহমানের এই সফর যদি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি এবং অভিবাসনের সঙ্গে জ্ঞানকে যুক্ত করতে পারে, তবে তা একবিংশ শতাব্দীর নতুন এশীয় ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সুযোগকে কৌশলগত সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর