শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন

ইসরাইলে নির্বাচনের ফল: সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা ও জটিল সমীকরণ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩০ সময় দেখুন

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশিত হলেও দেশটির পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ১২০ আসনবিশিষ্ট ইসরাইলি পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসনের প্রয়োজন, কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রধান কোনো দলই এককভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার জন্য দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা ও সমঝোতার নানা প্রচেষ্টা। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট—উভয়ের জন্যই সরকার গঠনের পথটি অত্যন্ত বন্ধুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো শিবিরের দখলেই প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় নির্বাচন পরবর্তী এই অচলাবস্থা কাটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পার্লামেন্টের আসন বণ্টনের হিসাব স্পষ্ট হলেও কে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনে ১৯টি আসন পেয়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখানো আরব দলগুলো বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সরকার তৈরিতে প্রধান নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, আইজেনকোট যদি আরব দলগুলোকে সাথে নিতে পারেন, তবে তার পক্ষে ৬৭ আসনের একটি শক্তিশালী জোট গঠন করা সম্ভব। তবে এটি তার ও তার ইহুদি মিত্রদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পদক্ষেপ। উল্লেখ্য, ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ আরব নাগরিক, যাদের সিংহভাগই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের প্রতি আস্থা রাখতে দ্বিধা বোধ করে। এর আগে ২০২১ সালে একটি আরব দল জোট সরকারে যোগ দিলেও সেই সরকার মাত্র ১৮ মাস টিকে ছিল। ইতিমধ্যে নেতানিয়াহু এই ধরনের জোটকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।

বিকল্প কৌশল হিসেবে নেতানিয়াহু আইজেনকোটের ডানপন্থী সহযোগীদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন। এমনটি সফল হলে নেতানিয়াহু ৬৭টি আসনের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন এবং আরব দলগুলোর পাশাপাশি অতি-অর্থোডক্স ও উগ্র-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো বিরোধী দলে চলে যাবে। এই ধরনের ঐক্যবদ্ধ সরকার দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার বা অতি-অর্থোডক্সদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে কার্যকর হতে পারে। তবে এই পথের বড় বাধা হলো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং চলমান দুর্নীতি মামলার কারণে আইজেনকোট ও তার সহযোগীরা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকারে না বসার শপথ নিয়েছেন। তাছাড়া সরকার এই ঘটনাগুলোর কোনো রাষ্ট্রীয় তদন্ত অনুমোদন করবে না, যা বিরোধী জোটের ভোটারদের অন্যতম প্রধান দাবি।

নেতানিয়াহু বর্তমানে বিরোধী শিবিরের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ফাটল ধরানোর কৌশল নিয়েছেন। তিনি তার সাবেক ডানপন্থী মিত্র নাফতালি বেনেট কিংবা অবিগদোর লিবারম্যানের মতো নেতাদের নিজের শিবিরে ফেরানোর চেষ্টা করতে পারেন। তবে তারা অধিকৃত অঞ্চলে বসতি সম্প্রসারণ নীতি সমর্থন করায় আরব দলগুলোর সাথে জোট বাঁধা তাদের জন্য কঠিন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধ এবং অতি-অর্থোডক্সদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিষয়ে মতপার্থক্য তাদের একত্র হওয়ার পথে বড় বাধা। আইজেনকোটের পক্ষেও নেতানিয়াহুর শিবির থেকে কাউকে ভাঙিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব, কারণ নেতানিয়াহুর দলের সদস্যরা তাঁর প্রতি ভীষণভাবে অনুগত।

শেষ পর্যন্ত কোনো দলই যদি সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী বছরের শুরুতে ইসরাইলকে আবারও সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। সেই সময় পর্যন্ত নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই ক্ষমতায় বহাল থাকবে। এই পরিস্থিতি বিরোধী শিবিরের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনে ভোট দিতে বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার নাগরিক দ্বিতীয়বার একইভাবে ফিরে আসবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এই বাড়তি সময়টুকুকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু তার জোটকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবেন। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর চরম অচলাবস্থার কারণে ইসরাইলে মাত্র সাড়ে তিন বছরে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যেকোনো জোট গঠনের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন কঠিন আপস করতে হবে, অন্যথায় দেশটিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর সরকারই দায়িত্ব পালন করবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর