সুদানের দারফুর অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্থানীয় বাজারে ভয়াবহ সামরিক ড্রোন হামলায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই ঘটনায় অন্তত ১১৩ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লইয়ার্স’-এর তথ্যমতে, নিহতদের বড় একটি অংশই নারী ও শিশু। সোমবারের এই হামলার পর থেকে ওই এলাকায় চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী বোমা হামলার আতঙ্কে তাঁদের দিন কাটে।’।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী নিয়ালায় অবস্থিত এই বাজারটিতে হামলার সময় আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই শহরটির বাজারে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী আরএসএফ যোদ্ধাদের কাছে পণ্য বিক্রির সময় ড্রোন হামলার কবলে পড়েন।
স্থানীয় এক সিগারেট বিক্রেতা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সেখানে শত শত আরএসএফ যোদ্ধা জড়ো হয়েছিলেন এবং রাত ৮টার দিকে অতর্কিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে অনেক যোদ্ধা ও খাবার বিক্রেতা নারী নিহত হয়েছেন। তাদের জমায়েতের ফাঁকে ফাঁকে নিজের দোকান সরিয়ে সিগারেট বিক্রি করতেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, যুদ্ধে কোনো নৈতিকতা নেই। এতে হতাহত ব্যক্তিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
হামলার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া অনেকেই বলছেন, বিস্ফোরণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণা, হামলায় অন্তত ১৪ জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যারা মূলত চা ও খাবার বিক্রির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ত্রাণকর্মী মুবারক বেখেইত জানান, হামলার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং কিছু ঘরবাড়ি থেকে এখনো লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নৈতিকতার অভাব এবং বেসামরিক মানুষের এই চরম মূল্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রতিশোধের আশঙ্কায় দুই প্রত্যক্ষদর্শীই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁরা প্রাণ হারান, প্রিয়জন ও ঘরবাড়ি হারান। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘বাজার, বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
এদিকে, স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেসের মুখপাত্র মোহাম্মদ দিদান ফেসবুক পোস্টে এই ঘটনাকে একটি ‘নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট’ বিমান হামলা হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি জানান, নিয়ালার পশ্চিমে দুমায়া শিবিরে তাদের হামলায় দেড় শতাধিক ‘মিলিশিয়া বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি’ নিহত হয়েছেন। তবে নিয়ালায় মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত জটিল হওয়ায় স্বাধীনভাবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী আরেকটি সংগঠন ‘সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক’ প্রাথমিকভাবে ২১ জন নিহত ও ৪০ জনের বেশি আহতের কথা উল্লেখ করেছে। গোলাবর্ষণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্যমতে, নিয়ালায় নিরাপত্তাঝুঁকি ও সামরিক অভিযানের কারণে আহতদের প্রকৃত সংখ্যা এবং পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যে কারণে তথ্যের অসংগতি তৈরি হচ্ছে। সংগঠনটির ভাষ্য, গোলাবর্ষণে বেশির ভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, বাজারে হামলার পরপরই দ্বিতীয় দফায় বেসামরিক এলাকায় আঘাত করা হয়। সংস্থাটির সহায়তায় পরিচালিত নিয়ালার একটি হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৩৬টি মরদেহ নেওয়া হয়, যার মধ্যে ২১ জন সাধারণ পোশাকে ছিলেন। জরুরি বিভাগে দেড় শতাধিক আহত মানুষকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্মীরা। এমএসএফ এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষকে সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন আমরা যে বাস্তবতা দেখি, তাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় বেসামরিক মানুষকে। দ্বিতীয় হামলায় হাসপাতালে ৩৬ জনের লাশ। সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে।’।
সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যকার এই সংঘাত চার বছরে গড়িয়েছে, যা দেশটিতে তীব্র দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ড্রোনের ব্যবহার দেশটিতে বেসামরিক মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে জাতিসংঘের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়ালায় অপুষ্টির শিকার শিশুদের হার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি মাসে এই হার ছিল ৫ শতাংশ, যা আগস্টে বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুতির এই বড় সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
Leave a Reply