শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

লক্ষ্মীপুরে জমজমাট সুপারির হাট

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৪ সময় দেখুন

লক্ষ্মীপুর জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন সুপারির উৎসবের আমেজ। জেলার শতাধিক হাটবাজারে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক। সড়ক ও বাজারের মোড়ে মোড়ে সাজানো সুপারির বিশাল স্তূপ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে সুপারি কিনে এসব বাজারে নিয়ে আসছেন, আর বাইরে থেকে আসা পাইকাররা তা কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সড়কে কিছু দূর পরপর সুপারির বিশাল স্তূপ। ক্রেতারা এক স্তূপ থেকে অন্য স্তূপে গিয়ে সুপারি দেখছেন। দরদামে মিললেই সুপারি কিনে ভরছেন বস্তা কিংবা ঝাঁকায়। এরপর যানবাহনে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন দূরদূরান্তে। অবশ্য বাজারটি কেবল নয়, লক্ষ্মীপুরের শতাধিক হাটবাজারই এখন এভাবে দিনরাত মুখর সুপারি ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে।

বাজারগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, সাপ্তাহিক হাটগুলোতে পাকা সুপারির কদরই বেশি। উত্তর তেহমনী বাজারের বিক্রেতা নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে প্রতি পণ (৮০টি) পাকা সুপারি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় এবং প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) সুপারি ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেবল উত্তর তেহমনী বাজারেই প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কোটি টাকার সুপারি লেনদেন হয়। বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা এবং রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়ে থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হিসেবে সুপারি চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

সুপারি বিক্রির জন্য বিখ্যাত বাজারগুলোর মধ্যে রায়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা এলাকা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সদর উপজেলার দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া, জকসি এবং রামগঞ্জের সোনাপুর, কাঞ্চনপুর ও করপাড়া বাজারেও মৌসুমে বিপুল পরিমাণ সুপারি কেনাবেচা হয়।

দীর্ঘ দুই যুগ ধরে সুপারির ব্যবসা করছেন রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান। তিনি জানান, ভরা মৌসুমে স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুপারি সংগ্রহ করে তিনি দেশের নানা প্রান্তে সরবরাহ করেন। এই মৌসুমে কেনাবেচার চাপ বেড়ে যায় এবং একার উদ্যোগেই প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয় বলে তিনি জানান। সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, ভেজানো ও শুকানোর কাজেও যুক্ত থাকেন অনেকে। সুপারির বাজার ভালো থাকলে কৃষকের আয় বাড়ে, পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ উপকৃত হন।’।

চাষিরা সাধারণত তিনভাবে সুপারি বিক্রি করেন: কাঁচা, ভেজানো ও শুকনা। কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশই স্থানীয়রা পুকুর, খাল বা ডোবায় ভিজিয়ে সংরক্ষণ করেন। রায়পুরের চর মোহনা গ্রামের কৃষক মফিজ উদ্দিন জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সুপারি পেকে গেলে মজুতদারেরা তা কিনে পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। পরবর্তীকালে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের দিকে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে তারা বাড়তি দাম পান। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ভালো দাম পাওয়ার আশায় লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সুপারির বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক। কেনা সুপারির বড় অংশ পানিতে ভিজিয়ে রাখেন।

সুপারি কেবল বাগানমালিকদেরই আয় বাড়াচ্ছে না, বরং কর্মসংস্থান তৈরি করছে হাজারো শ্রমিকের। গাছ থেকে সুপারি সংগ্রহের কাজ করা রায়পুরের কেরোয়া এলাকার রুবেল হোসেন জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। প্রতি গাছ থেকে সুপারি পেড়ে তিনি ১০ টাকা করে মজুরি পান। মৌসুমে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে তাঁর দৈনিক আয় হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। পরিবারের খরচ মিটিয়ে তিনি এই আয় থেকে সঞ্চয়ও করতে পারছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। একটি গাছ থেকে প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। জেলায় বর্তমানে বাগানের পরিমাণ ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর, যা গত বছর ছিল ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর। গত মৌসুমে ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদিত হলেও এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন। একবার সুপারি চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিবেশে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ জানান, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসই সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়। লক্ষ্মীপুরের মোট উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে, যার পরেই রয়েছে সদর উপজেলার স্থান। তিনি আরও বলেন, পাকা, শুকনা ও ভেজানো—সব মিলিয়ে এ বছর কৃষকেরা প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বিক্রি করতে পারবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর