বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ৮৬ পৃষ্ঠার একটি নতুন কান্ট্রি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)। ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিরোধী দলগুলোর মুক্ত চর্চার সুযোগ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সংঘাত কমে আসা এবং বিপুল সংখ্যক পুরোনো মামলা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো যেমন স্থান পেয়েছে; তেমনই পুলিশের জবাবদিহিতা, সাবেক শাসকদলের সমর্থকদের নিরাপত্তা ও সংস্কার বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা, এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারগুলোর সীমিত বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে।
গাইডলাইনটি প্রস্তুতির লক্ষ্যে গত ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি ‘কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম’ (CPIT) বাংলাদেশ সফর করে। প্রতিনিধিদলটি বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং আগস্টের গোড়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার তথ্য সংগ্রহ করে। সফরকালে প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, পুলিশ, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, আইনি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার মোট ২৪ জন ব্যক্তির সঙ্গে ১৫টি পৃথক সাক্ষাৎকার পরিচালনা করেন। সংগৃহীত সেই তথ্যাবলীর ওপর ভিত্তি করেই গত ১৪ই অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে হোম অফিস। ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত, ‘কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম’ (CPIT)-এর ৩ জন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে স্থিতিশীল হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের অভিমত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমানে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বেশি বাকস্বাধীনতা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার ভোগ করছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ (NCP) অন্যান্য দলগুলো এখন অবাধে দলীয় কর্মসূচি, জনসভা ও সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। এর কারণ হলো ক্ষমতায় থাকাকালীন দলটির দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা আগের তুলনায় অনেক কমেছে এবং বর্তমানে তা মূলত স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে সহিংসতার ঘটনা আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেক কম ছিল। পরবর্তীতে নির্বাচন-উত্তর সহিংসতাও হ্রাস পায়। এসব ঘটনার পেছনে সাধারণত স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধ কাজ করে।
অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নানা বিতর্কের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের ক্ষোভ রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে সংগঠন হিসেবে দলটি নিষিদ্ধ থাকলেও তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী অপকর্ম বা দমন-পীড়নে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, তারা নিজ নিজ এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন। তবে যারা প্রকাশ্যে দলীয় অবস্থান প্রকাশ করছেন, তারা বিভিন্ন সামাজিক বিদ্বেষ বা হয়রানির মুখে পড়ছেন। ফলে সাবেক শাসকদলের বহু সদস্য আত্মগোপনে গেছেন, অন্য দলে যোগ দিয়েছেন কিংবা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে দায়ের করা ভুয়া বা হয়রানিমূলক মামলাগুলোর একটা বড় অংশই ইতোমধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়, ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বাতিল করা হয়েছে এবং বাকি পুরোনো মামলাগুলোর পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ও বিগত শাসনামলের বিভিন্ন অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী ও কর্মকর্তা এখনও ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা সাধারণ আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচারাধীন। এতে কেউ কেউ জামিন পেলেও অনেকেই কারাগারে বন্দি রয়েছেন। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা এমন ২১ হাজারেরও বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
বৃটিশ হোম অফিস স্পষ্ট করেছে যে, ইউকেতে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অভিবাসনের আবেদনসমূহ মূল্যায়নে কর্মকর্তাদের সহায়তার উদ্দেশ্যে তথ্যসংগ্রহ হিসেবে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত আশ্রয় মঞ্জুর বা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্দেশ করে না। এতে যুক্ত সাক্ষাৎকারগুলো নিরপেক্ষ সূত্রে যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটির ভূমিকায়ও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই তার দেওয়া প্রতিটি তথ্যের প্রতি হোম অফিসের সমর্থন নয়; তথ্যগুলো অন্যান্য প্রকাশ্য উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
Leave a Reply