শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

সৌদির অর্থনীতিতে হুতিদের আঘাত, বাড়ছে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে এখন সৌদি আরবকে চাপে ফেলাই হুতিদের প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির কৌশলগত অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিনিয়োগ সম্মেলনকে লক্ষ্যবস্তু করে একের পর এক হামলা চালিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) উভয় সংকটে ফেলতে চাইছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, একদিকে ইয়েমেন ইস্যুতে নিজেদের দাবিদাওয়া পূরণ করতে রিয়াদকে বাধ্য করা এবং অন্যদিকে ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ শিথিল করার ক্ষেত্রে ডনাল্ড ট্রাম্পকে চাপে ফেলতেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এসব দাবি পূরণ হলে ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হুতিদের শাসন আরও সুসংহত হবে। তবে এই কৌশল সৌদি যুবরাজকে কঠিন এক সংকটে ফেলেছে বলে মনে করছেন সৌদি অবস্থান সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো। হুতিদের ধারণা, সময় ও ভৌগোলিক অবস্থান তাদের পক্ষে কাজ করছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠতাও বেড়েছে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের সূচনা হওয়ার পর থেকে ইরান কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের মাইকেল নাইটসের মতে, ওয়াশিংটনের নেওয়া কৌশলের প্রভাব থেকে বাঁচতে এবং তার মূল্য বাড়িয়ে দিতেই তেহরান তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে সৌদির দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত করছে। নাইটস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরান এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রয়েছে এবং সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে সৌদির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে চাপ তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও হুতিদের হিসাব হলো, সৌদি আরবের সমৃদ্ধি, বিপুল বিনিয়োগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অস্থিতিশীলতার প্রতি সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিকে দুর্বল জায়গায় আঘাত করা সম্ভব। পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত সংঘাতের মধ্যে সৌদিকে চাপের মুখে রাখাই এই কৌশলের লক্ষ্য। পরে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ কম। পরে ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত বিষয়টি পিছিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ শিথিল করার বিষয়ে হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান হুতিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং তেহরানের ওপর চাপ কমলে হুতিদের জন্য আর্থিক ও সামরিক সহায়তা বজায় রাখা সহজ হবে। তবে হুতিদের নিজস্ব দাবিও দীর্ঘদিনের; তারা ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযান বন্ধ, বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোর ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, ইরানের সাথে নিয়মিত বিমান চলাচল চালুর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, রিয়াদের ওপর এই চাপ অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে তৈরি হবে। সৌদি, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অস্ত্র ও অর্থের যে প্রবাহের ওপর হুতিদের নির্ভরতা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী তার গুরুত্বপূর্ণ উৎস ইরান। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না রিয়াদ; বরং আলোচনার পথ বেছে নিতে হবে।

সৌদি যুবরাজের জন্য এই পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে হুতিদের দাবি মেনে নিলে একটি গোষ্ঠী হিসেবে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, আবার সংঘাত অব্যাহত থাকলে মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে; রিয়াদের প্রধান তেল সম্মেলন ব্যাহত হয়েছে এবং শীর্ষ নির্বাহীরা সরে দাঁড়িয়েছেন। ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এফআইআই) মতো আয়োজনেও অংশগ্রহণকারীদের সশরীরের বদলে দূর থেকে যুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

হুতিদের হামলার পরিধি বর্তমানে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর স্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর আগেও ২০১৯ সালে আরামকো স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগেরের মতে, সৌদি নেতারা এখন আলোচনার পরিবর্তে সামরিক চাপ প্রয়োগকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখছেন। লনডন স্কুল অব ইকোনমিকসের বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেসের ভাষ্যমতে, হুতিরা এখন নিজেদের বিজয়ীর অবস্থানে রেখে দরকষাকষি করতে চাইছে। আরামকোর স্থাপনায় হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনটির কয়েকটি তলায়। ওই বক্তব্যগুলোতে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চেয়ে থাকলেও, সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে ট্রাম্পের অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন কেবল লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছে, যা রিয়াদের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরবের তুলনায় হুতিদের হারাবার মতো সম্পদ অনেক কম, যা তাদের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা। ইয়েমেন বিশ্লেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি মনে করেন, ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সমর্থনে তৈরি হওয়া শান্তির রূপরেখাটি বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতের যে গতিপথ দেখা যাচ্ছে, তা ২০১৫ সালের চেয়েও ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সৌদি আরব আগের চেয়ে কম আঞ্চলিক মিত্র নিয়ে লড়াইয়ে নামবে। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারি মিডিয়া অফিস, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হুতিদের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি সরকারের মিডিয়া দপ্তর, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হুতিদের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি। এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার পর ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তিনি বলেন, ‘তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আর আলোচনার সুযোগ নেই। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর