মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ন

জ্বালানি চুক্তিতে বেকায়দায় ট্রাম্প, দানা বাঁধছে বিতর্ক

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোট শুরু হয়েছে। এমন এক সংকটময় সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট মেটাতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার বিকেলে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তির ঘোষণা দেন। এই চুক্তির আওতায় আগামী কয়েক মাসে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, এতে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানি খরচ কমবে। বিশেষ করে মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে ডিজেলের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভোটারদের অসন্তোষ প্রশমিত করার চেষ্টা করছেন তিনি। কৃষিযন্ত্র চালানো থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য বাজারে পরিবহন-সব ক্ষেত্রেই এই জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ইরান যুদ্ধকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন অনেক মার্কিন ভোটার। ইরান যুদ্ধ পরিচালনা এবং দেশের অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা নিয়েও বাড়ছে অসন্তোষ।

তবে ট্রাম্পের এই কৌশল নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির চারজন সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। রবিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে সিনেটররা অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে কংগ্রেস পুতিনের যুদ্ধের অর্থায়ন ঠেকাতে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। ট্রাম্পের বর্তমান উদ্যোগ সেই আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এদিকে, চুক্তির ঘোষণার দুই দিন পর ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি যুদ্ধবিরতির কথা প্রচার করেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; এই ঘোষণা নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, তাকে এ বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। তবে ইউক্রেন এ উদ্যোগ মেনে চলবে বলে মন্তব্য করলেও সোমবার তিনি কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলেন, পুতিন সম্ভবত ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পড়েন না। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, রাশিয়া যদি শীতকালে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ না করে, তবে ইউক্রেনও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। তার বক্তব্যে মনে হচ্ছিল, শীত মৌসুমে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধের বিষয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জেলেনস্কির সঙ্গে তার সম্পর্ক বেশ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জেলেনস্কি ট্রাম্পের সমালোচনার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যুদ্ধের অবসান ঘটানো সহজ হবে বলে দাবি করলেও ট্রাম্প এখন কখনো রাশিয়া, কখনো ইউক্রেনকে এর জন্য দায়ী করছেন। এমনকি শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের কাছে ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফাইন্যানশিয়াল টাইমস ও সিএনএনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওয়াশিংটন হুমকি দিয়েছে যে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ না হলে তাদের কাছে অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দেওয়া হবে। স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্যানজিয়া পলিসির প্রতিষ্ঠাতা টেরি হেইনস জানান, ট্রাম্পের এই আচরণ তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলেরই ধারাবাহিকতা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের এই জ্বালানি কূটনীতির সমালোচনাও কম নয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, যিনি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধবিরতির প্রতি সমর্থন জানালেও রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির কঠোর বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, এ ধরনের চুক্তি ইউরোপের নিরাপত্তা ও শান্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে, সব প্রচেষ্টার পরও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমলেও প্রতি গ্যালন এখনো ছয় ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সপ্তাহান্তের এই ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি বিবিসিকে জানান, হুতিদের এই হামলা প্রমাণ করে যে তাদের লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, বরং সামগ্রিক জ্বালানি কাঠামো। সব মিলিয়ে, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, ইউক্রেন সংঘাতের দায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় ট্রাম্প চারদিক থেকে চাপের মুখে পড়েছেন। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট নিরসনে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে তার জন্য। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামগ্রিক জনপ্রিয়তা কমছে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর