বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা এবার শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবারের দুর্গাপূজাকে ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকার ও প্রশাসন যদি আন্তরিক থাকে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকে, তবে সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন। ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বুধবার ছয় দিনের শারদীয় উৎসব শেষ হয়েছে। তবে সরকারপ্রধান, সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভূমিকা ও অবস্থান শঙ্কামুক্ত পরিবেশে উৎসব উদ্যাপনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমরা মনে করি, সরকারের উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব উদ্যোগ দুর্গাপূজায় নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্যমতে, সারা দেশে এবার মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। পূজা-অর্চনা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের বাদ্যে মুখর ছিল প্রতিটি মণ্ডপ। উৎসবের আগে গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরার মতো এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও উৎসবের আমেজ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি। খবর জানাচ্ছে, পূজা-অর্চনা, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের সমাগমে মুখর ছিল পূজামণ্ডপগুলো।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার ও প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই লক্ষাধিক আনসার সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া তিন স্তরের পুলিশি নিরাপত্তা ও সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব রুখতে সাইবার নজরদারিও জোরদার করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা এবার উৎসবকে শঙ্কা থেকে মুক্তি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার বাইরেও রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিরাও নিজ নিজ এলাকায় পূজার খোঁজখবর রেখেছেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সনাতন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং এনসিপি নেতারাও মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। বিগত সময়ে সরকারপ্রধানদের মূলত ঢাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আমরা দেখেছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে যে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার পরিবেশ তৈরি হতে আমরা দেখেছি, সেই বিবেচনায় এ বছরকে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। এই দায়িত্ব যেমন সরকার ও প্রশাসনের, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর।
তবে এই শান্তি ও সম্প্রীতির ধারা কেবল দুর্গাপূজার জন্য সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা যাতে বছরের প্রতিটি দিন ভয়হীন পরিবেশে আচার পালন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন স্থানে মাজারপন্থী, বাউল ও সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। মব-সহিংসতার এসব ঘটনায় নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার মূল শর্তই হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই বহু ধর্মের ও মতের দেশ। তাই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও দেশের স্থিতিশীল অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে এই সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি অটুট রাখা অপরিহার্য। এবারের শান্তিপূর্ণ উৎসব থেকে প্রাপ্ত স্বস্তি সামনের দিনগুলোতেও বজায় থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
Leave a Reply