প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার রংপুর সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের জন্য সমঅধিকার ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রংপুর ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এই আহ্বান জানান। মন্দির প্রাঙ্গণে শারদীয়া শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনে সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। বাংলাদেশ আমাদের সবার এবং এই সম্প্রীতি ধরে রেখেই রাষ্ট্র গড়তে হবে। প্রধানমন্ত্রী মন্দিরে এসে পূজারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করার সময় কোনো ধর্মের মানুষকে আলাদা করে দেখা হয়নি। বেশিদিন আগের কথা নয়, দুই বছর আগে বাংলাদেশে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে নবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমরা আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশ গড়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করি। হতে পারে কোনো অঞ্চলে আমাদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে, কোনো অঞ্চলে আমাদের সদস্য নির্বাচিত হয় নাই।
অনুষ্ঠানে মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন। এর বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী মন্দিরটির উন্নয়নের জন্য ১০ লক্ষ টাকার একটি চেক অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। পাশাপাশি মন্দিরের পেছনের হোস্টেল অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য নয়, বরং সরকার সবার জন্য কাজ করতে চায়।
তিনি বলেন, নির্বাচনে যে ভোট দিয়েছে কিংবা দেয়নি, সরকার সবার জন্যই কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় সামর্থ্য অনুযায়ী সব এলাকার মানুষের জন্য সমানভাবে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া সরকারের লক্ষ্য। এই ধারাবাহিকতায় রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য সরকার ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো, সেতু-কালভার্ট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই দেশের ছাত্রজনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাঁধে যে স্বৈরাচার চেপে বসেছিল, তাকে বিতাড়িত করেছে। রাষ্ট্রের যে অর্থনৈতিক অবস্থা আছে, তা বিবেচনা করে সব এলাকার সমবণ্টনের মাধ্যমে সমানভাবে উন্নয়ন করতে চাই। এর মধ্যে সেতু-কালভার্ট, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ রয়েছে।
দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যখন ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজ করছে, তখন একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত না করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। কোনো দাবি বা বক্তব্য থাকলে তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এমন কার্যক্রম থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব ধর্মের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। ঐক্যের বদলে একটি মহলের ভিন্ন চিন্তা।
সফরকালে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় পথসভায়ও অংশ নেন সরকারপ্রধান। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপিকে দেশের দায়িত্ব প্রদানের পর থেকে সরকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো উন্নত বাংলাদেশ গড়া। যেখানে সন্তানদের শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। এই লক্ষ্য অর্জনে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিশ্রম করার আহ্বান জানান তিনি। এই দেশকে গড়ে তুলতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। জনগণের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে বেলা ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রংপুর পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার প্রমুখ।
অন্যান্যদের মধ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রংপুরের উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা।
Leave a Reply