টানা ১২ বছর ভারতের ক্ষমতায় থাকার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। দেশজুড়ে বিশেষত ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলন সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের ফলে ১৩ কোটি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগে তরুণরা মোদি সরকারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছেন। এই প্রতিবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন উঠে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। তিনি বর্তমানে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নেহা বোরা দেখতে ছিপছিপে গড়নের, চুল কালো এবং কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর ও বলিষ্ঠ। রাজপথের এই কৌশলী কর্মী আন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারের নীতি ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশের কাছে এক আইকনে পরিণত হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না নেহা বোরা। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সংসদ ও বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায়ও বাম দলগুলো বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিজেপি বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার বিরোধী পক্ষ ও সমালোচকদের বর্ণনা দিতে নিয়মিত এই শব্দগুলো ব্যবহার করে।
গত ১২ অক্টোবর প্রধান বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে পদযাত্রা করেন।
সেই মিছিলে রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি অত্যন্ত সক্রিয় দেখা গেছে নেহা বোরাকে।
এর আগে ১০ অক্টোবর কমিশন অভিমুখে হাজার হাজার তরুণের পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সরকার পুরো নয়াদিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল। অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়।
পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের দ্রুত আটক করলেও সেদিন বিকেলে নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে সবাইকে চমকে দেন। ‘ওয়ান পিস’ অ্যানিমে টি-শার্ট পরিহিত নেহা দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই নিজের অবস্থান জানান দেন। কিন্তু নেহা আন্দোলনকারীদের ধরতে আসা নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার এক কৌশল রপ্ত করেছেন। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে।
নেহা বোরার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে চলা কৌশল নিয়ে ডিজিটাল বিশ্বে রীতিমতো আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
সফটওয়্যার ডেভেলপাররা তাঁকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের একটি ভিডিও গেম পর্যন্ত তৈরি করেছেন, যেখানে মূল চরিত্রটি পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এগিয়ে যায়। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ মনে করেন, নেহার কথা বলার ভঙ্গি ও নেতৃত্বের গুণের কারণে অনেকেই তাঁকে ‘গণতন্ত্রের দেবী’ হিসেবে দেখছেন। অবশ্য কোনোভাবেই নিজেকে দেবতার আসনে দেখতে চান না এই ছাত্রনেত্রী। হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে তাঁর তুলনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা থাকলেও তিনি এগুলোকে এড়িয়ে চলছেন। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি।
উত্তরাখণ্ডের খাতিমা শহরে বেড়ে ওঠা নেহার পরিবার মূলত বিজেপির সমর্থক ছিল। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করায় বিভিন্ন শহরে কাটলেও কিশোর বয়সে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে অধ্যয়নরত নেহা সেখানেই আইসার রাজনীতিতে যুক্ত হন। এন সাই বালাজি জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে টানা কয়েক সপ্তাহ অনশন করার সময় থেকেই নেহা জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। ওই অনশনের সময় নেহার মা তাঁকে দেখতে এলে তাদের রাজনৈতিক ভিন্নমত সবার সামনে চলে আসে, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এ সময় পদযাত্রায় সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে তিনি হাত রেখেছিলেন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান ধর্মঘট করেন এবং পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে।
আইসার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের আগস্টে গঠিত এই সংগঠনটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র শাখা হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হলেও নব্বইয়ের দশকে তারা সংসদীয় ধারায় ফিরে আসে। তবে তাদের কর্মপদ্ধতিতে আজও ভগত সিংয়ের বিপ্লবী কৌশলের কিছুটা ছাপ রয়েছে বলে নেহার বন্ধু দানিশ আলী জানান। দানিশ বলেন, দীর্ঘদিন গোপন থাকার কারণে তাদের আন্দোলনের কৌশল অনেকটা গেরিলা যুদ্ধের মতো, যা বর্তমান সময়েও কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো। ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, নেহা বোরার মতো তরুণ নেতাদের মূলধারার রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কংগ্রেসের মতো বড় জাতীয় দলে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, সরাসরি ক্যাম্পাস থেকে নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে লড়াই করার মতো সাংগঠনিক ভিত এখনো আইসার নেই। অন্যদিকে, সরকারপন্থীদের কাছে ‘দেশবিরোধী’ তকমা পাওয়া নেহা এবং তাঁর সহকর্মীরা এসব অপপ্রচারে কান না দিয়ে নিজেদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি ‘আরবান নকশালদের’ বিরুদ্ধে যে সতর্কতা জারি করেছিলেন, তা মূলত বামপন্থীদের প্রতি ভীতি থেকেই এসেছে বলে নেহা মনে করেন। বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেসব আইনকে সমালোচকেরা কঠোর ও দমনমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অ্যাগনেস এই উপাধি পেয়েছিলেন। অন্যদিকে মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বাম রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে।
নেহা বোরার দাবি, ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা এনে দেওয়া বিপ্লবী ধারার উত্তরসূরি হিসেবে বামপন্থীরা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেন। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনীবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত তাঁর রাজনৈতিক জাগরণ ঘটে। জেএনইউয়ে পড়ার সময় প্রতিটি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা, লিফলেট বিলি করা বা আইসার জন্য ভোট চাওয়া—এসবই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১০ অক্টোবরের পর থেকে তিনি বারবার পুলিশের চোখ এড়িয়ে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন, যার প্রতিটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
বন্ধুরা জানান, রাজনীতির বাইরেও নেহা গান করতে পারেন এবং ডাফলি বাজাতে বেশ দক্ষ। তবে বর্তমানে তাঁর পুরো সময় জুড়েই রয়েছে আন্দোলন ও ছাত্ররাজনীতির হিসাব-নিকাশ। তিনি নিজেই বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে হতাশ ভারতের উন্নত জীবনের প্রত্যাশী মানুষরাই তাঁকে রাজনীতির ময়দানে শক্তি জোগাচ্ছেন। পুলিশের শক্ত বাঁধন উপেক্ষা করে নেহা যেভাবে একের পর এক কর্মসূচি চালিয়ে নিচ্ছেন, তা ভারতের চলমান রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েক মাস আগেও ছাত্ররাজনীতির বাইরে নেহা বোরার নাম খুব বেশি মানুষ জানতেন না।
Leave a Reply