শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন

দুই পা খুইয়ে ৮ মাস গর্তে

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৯ সময় দেখুন

ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো যুদ্ধক্ষেত্রে এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত।

ড্রোন হামলায় তার এক পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অন্য পা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাঁচার তাগিদে তিনি নিজেই ছুরি ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’। ধীরে ধীরে তার বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে।

এরপর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটারের একটি গর্তে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় তিনি লুকিয়ে ছিলেন। চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলা ভ্লাসেনকো আশ্রয় নেন স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটি গর্তে।

চারপাশে প্রতিনিয়ত শত্রুপক্ষের ড্রোনের টহল এবং উদ্ধারের পথে চরম ঝুঁকির মুখে তিনি একসময় বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

অবশেষে গত ৪ অক্টোবর এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানটি সম্পন্ন হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, পাঁচ বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধে কোনো সেনাকে আকাশপথে ড্রোন দিয়ে উদ্ধারের এটিই প্রথম নজির। খারকিভ অঞ্চলের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভ্লাসেনকো তার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তার দুই পায়ের কাটা অংশ এখনো ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো।

ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য হিসেবে গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব নিতে যান। সেখানে তিনি ‘বাসকি’ নামের এক সঙ্গীর সঙ্গে ছোট্ট একটি মাটির বাংকারে থাকতেন। নিয়মিত ড্রোনের মাধ্যমে তাদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হতো। কিন্তু এক পর্যায়ে সেনাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে যাওয়া চারজন সেনা সদস্যের সবাই সেখানে প্রাণ হারান। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো হারনেসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাংকারে পানি ঢুকে পড়লে তারা কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেখানেই রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোনের হামলায় বাসকি নিহত হন এবং ভ্লাসেনকো গুরুতর আহত হন। নিজের পায়ের হাড় বেরিয়ে আসায় এবং পচন ধরতে শুরু করায় তিনি অত্যন্ত যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের ডান পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন করে রক্তপাত বন্ধ করতে টুর্নিকেট ব্যবহারের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন তিনি। প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম না যে কোথাও বনের মধ্যে পড়ে যাব।

ওই এলাকাটি ‘কিল জোন’ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সাঁজোয়া যান বা পিকআপ দিয়ে তাকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। পূর্বে পাঠানো দুটি চালকবিহীন যান শত্রুপক্ষের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ‘অ্যালেক্স’ জানান, পরিস্থিতি যখন প্রায় নিরাশাজনক হয়ে পড়ছিল, তখন তারা গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি ছয় প্রপেলারের একটি ভারী মালবাহী ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। এই ড্রোনটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করতে সক্ষম। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে ড্রোনে ঝুলে আকাশে ওড়ার সময়ও ভয় তাকে ছাড়েনি।

অভিযানটি সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। অক্টোবরের শুরুর দিকে একটি হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ ফোন ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ৪ অক্টোবর উদ্ধারকারী ড্রোনটি সেখানে পৌঁছায়। মূল ড্রোনটির নিরাপত্তায় আরও তিনটি ছোট ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যাতে শত্রুপক্ষ বিভ্রান্ত হয়। এছাড়া ইউক্রেনীয় বাহিনীর এফপিভি ড্রোন, কামান এবং স্থির-পাখার ড্রোন দিয়ে টানা দুই ঘণ্টা রুশ ড্রোনের অবস্থানে আক্রমণ চালানো হয়, যাতে উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ থাকে। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো। এসব ড্রোনের সাহায্যে দূর থেকে বসেই সরাসরি দৃশ্য দেখে আক্রমণ চালাতে পারেন চালকেরা। ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও তার সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা।

প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ানে ভ্লাসেনকোকে মাটি থেকে ৭০ মিটার উচ্চতায় ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়। সব শঙ্কা কাটিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়।

ভ্লাসেনকো জানান, ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তার বড় ভয় ছিল পানিতে পড়ে যাওয়ার, কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। ৪৯১ দিন সম্মুখসারিতে কাটানোর পর এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানটি সম্পন্ন হয়েছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ও ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওচিত্রের সঙ্গে ভ্লাসেনকোর বর্ণনা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকার কারণে ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন কর্মকর্তারা। নিরাপত্তার কারণে সেই স্থানের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর