ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সরকারি সূত্র জানায়, এ হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। আল-মাশিক প্রাসাদটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি সমর্থিত সরকারের প্রধান কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। সংঘাতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি সরাসরি হামলার শিকার হলো। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদির বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেয়ায় সৌদি আরব এখন হুতিদের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানি নিশ্চিত করেছেন যে, হামলার সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা অক্ষত ও নিরাপদ ছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রাসাদের চারপাশ জুড়ে বেশ কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সরকারি তথ্যমতে, বিদ্রোহীরা এই আক্রমণে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাসিম বুহাইবেহ জানান, হতাহতদের তালিকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বেসামরিক কর্মীরা রয়েছেন।
এদিকে হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন, এডেনে সৌদি অভিযানের একটি সদর দপ্তরে তারা এই বোমাবর্ষণ চালিয়েছেন। তিনি বলেন, সৌদি বাহিনীর উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করার নীতি থেকেই এই হামলা হয়েছে। হুতি নিয়ন্ত্রিত সাবা বার্তা সংস্থার মতে, ওই স্থাপনাটি সৌদি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখানে অস্ত্রের মজুদও ছিল। তবে এসব দাবির সত্যতা নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছে, যার ধারাবাহিকতায় সানা দখলের পর সরকার এডেনে সরে আসতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইয়েমেনের পরিস্থিতি আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে সরকারি বাহিনী হুতিদের দখলকৃত এলাকা পুনরুদ্ধারে নতুন করে অভিযান শুরু করে, যার ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিকটবর্তী কিছু কৌশলগত এলাকা পুনর্দখলের দাবি করেছে সরকার। ওই বছর হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য করে। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর সেই যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটে।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ডেও আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়েছে হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, চলতি মাসে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ২০টি হামলা হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও ৩৩৩ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ইয়েমেন সীমান্তের কাছে আভা বিমানবন্দরে হামলায় আরও তিনজন নিহত এবং ২৮ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে জোট।
সৌদি আরবের অভিযোগ, আঞ্চলিক বিভিন্ন শক্তির সহায়তায় হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরকবাহী নৌযানের মতো উন্নত সামরিক প্রযুক্তি অর্জন করেছে। রিয়াদ ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, ইরান হুতিদের নিয়মিত অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে। এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার পরিচালনা পরিষদ, বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজ চলাচলের অবকাঠামোর ওপর বারবার আক্রমণকে তারা উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছে। এতে দেশটিতে মানবিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো। এতে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার এবং সৌদির উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগতির নৌযান।
Leave a Reply