বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৯ অপরাহ্ন

পুরান ঢাকার চম্পা বিবির সমাধি

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২১ সময় দেখুন

পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাট ও চকবাজারের মধ্যবর্তী এলাকায় এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চম্পা বিবির স্মৃতিবাহী সমাধিসৌধ। এলাকাটি এখন ‘চম্পাতলী’ নামেই পরিচিত এবং এখানকার রাস্তার নাম রাখা হয়েছে ‘চম্পাতলী লেন’। দীর্ঘ সাড়ে তিন শ বছর ধরে এই সমাধি ঘিরে রহস্য ও ঐতিহাসিক বিতর্কের শেষ নেই। গম্বুজের ওপর শেওলা আর লতাগুল্মে ঢাকা এই স্থাপনাটি কালের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকলেও এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার অভাব প্রকট। গম্বুজের গায়ে শেওলা, চারপাশে লতাগুল্ম। চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে যত জটিল রহস্যই থাকুক, তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া অতটা জটিল নয়। বুড়িগঙ্গার তীরের অদূরে ঢাকার অতি বিখ্যাত ও ততোধিক দুর্দশাগ্রস্ত মোগল স্থাপনা ছোট কাটরার প্রথম ফটকের কাছেই চম্পা বিবির সমাধি। ছোট কাটরার সঙ্গে তুলনা করলে চম্পা বিবির সমাধিসৌধের হাল এখনো বেশ ভালো বলেই কবুল করতে হয়। যদিও এর গম্বুজ ছেয়ে গেছে শেওলায়, আর চারপাশ দিয়ে গজিয়ে ওঠা লতাগুল্মের পরাক্রমে স্থাপত্যশৈলী চোখে দেখার উপায় নেই। সরু এই পথ ধরে চলে গেলে সমাধিসৌধটি চোখে পড়ার সম্ভাবনা বিশেষ নেই।

সমাধিসৌধের ফটকে বসানো পাথরের ফলক থেকে জানা যায়, ১৬৭১ সালে সুবাদার শায়েস্তা খান এটি নির্মাণ করেছিলেন। ফলকটি স্থাপনের সময়কাল জানালেও চম্পা বিবি আসলে কে ছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। মুনতাসীর মামুনের গবেষণায় তাঁকে নবাবের কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর বইয়ে চম্পা বিবিকে নবাবের স্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আবার হাকিম হাবিবুর রহমান ও রহমান আলী তায়েশের মতে তিনি নবাবের উপপত্নী হতে পারেন। চম্পা বিবির কোনো প্রতিকৃতি বা নিশ্চিত বংশপরিচয় না থাকায় এই ধোঁয়াশা আজও রয়ে গেছে। সমাধিসৌধের ফটকের ওপর পাথরের ফলকে লেখা, ‘ছোট কাটারা স্থিত চম্পা বিবির মাজার, সায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে সমাধিটি বর্গাকার, যার প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য বাইরের দিক থেকে ৭.২৭ মিটার। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই সৌধটির চারদিকের দেয়ালে চারটি দরজা রয়েছে, যা সরু মিনার দ্বারা অলংকৃত। ছাদের ওপরের গম্বুজটি আট কোনাকৃতির একটি ড্রামের ওপর বসানো। ঐতিহাসিকভাবে ছোট কাটরার প্রাঙ্গণের অংশ হিসেবে এটি নির্মিত হলেও বর্তমানে এটি বিভিন্ন ব্যক্তিগত মালিকানাধীন স্থাপনার আড়ালে ঢাকা পড়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যানুযায়ী, শায়েস্তা খান ১৬৬৩ সালে ছোট কাটরা নামে তিনতলা বিশিষ্ট ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নবাব নিজে লালবাগের কেল্লায় বাস করলেও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র খোদাবন্দ খান ওরফে মির্জা বাঙালি এবং চম্পা বিবি এখানে বসবাস করতেন বলে ধারণা করা হয়। কালক্রমে এই অঞ্চলের মালিকানা বহু হাতবদল হয়েছে। ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুন জানিয়েছেন, ছোট কাটরা একসময় ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো। পরবর্তীতে মুন্সী রহমান আলী তায়েশ তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কোম্পানি আমলে শেফার্ড নামের এক পাদরি ছোট কাটরায় বসবাসের সময় মূল সমাধিটি ধ্বংস করেছিলেন, যার ফলে আদি রূপটি হারিয়ে গেছে।

এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’ অনুযায়ী, চম্পা বিবির মাজারটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে এর আদি ও নান্দনিক রূপটি বিলুপ্তির পথে। সমাধির অন্দরমহল বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ। লোহার গ্রিলের তালাবদ্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকালে সাদা গিলাফে মোড়ানো সমাধিটি দেখা যায়, যেখানে এখন নিয়মিত পরিচর্যার অভাব সুস্পষ্ট। কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই বলে মাজারটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় সাতটি পরিবারের ওপর বর্তায়। ব্যবসায়ী তারা মিয়ার ছেলে মো. মাসুম জানান, তারাই সম্মিলিতভাবে জায়গাটি তদারক করেন এবং মাঝেমধ্যে আগাছা পরিষ্কারের কাজ করেন। অবশ্য তাঁর সমাধির অবস্থাও খুব সুবিধার নয়।

শৈল্পিক ও স্থাপত্যের দিক দিয়ে শায়েস্তা খান এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন হিসেবে লালবাগ কেল্লার ভেতরে অবস্থিত কন্যা পরী বিবির মাজার এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে শায়েস্তা খান মসজিদ আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু চম্পা বিবির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব স্পষ্ট। সরকারিভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না পাওয়ায় পুরান ঢাকার এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্যটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তা প্রত্নতত্ত্ব প্রেমীদের কাছে বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে আসছে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর