সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রুদ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সিজিপিএ-৪ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এই অনন্য সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ড. মোহাম্মদ আতহার উদ্দিন স্বর্ণপদক। জীবনের সবচেয়ে বড় এই অর্জনকে নিজের গৌরবের জায়গা হিসেবে দেখছেন হান্নান। সাফল্যের এই গল্পটি কেবল একটি পদক পাওয়ার নয়, বরং চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্নপূরণের এক দৃষ্টান্ত। এই অর্জন দিয়ে তাঁকে দেখাতে পেরেছি, এটাই সবচেয়ে আনন্দের।’।
হান্নানের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তার পাশে ছিল অদম্য মনোবল। শ্যামনগরের ভুরুলিয়া সিরাজপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি ও তার যমজ ভাই আব্দুল মান্নান মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫সহ চমৎকার ফলাফল করেন তারা। দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে মা নাসিমা খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা অনেক কষ্ট করেছেন। ২০১৬ সালে এসএসসি পাসের পর ব্র্যাক ব্যাংক ও ট্রাস্টের ‘অদম্য মেধাবী’ শিক্ষাবৃত্তি তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ ও এইচএসসিতেও দুজন ভালো ফল করেন। কথাটি বলার পর নিজের মধ্যেই একধরনের জেদ তৈরি হয়েছিল হান্নানের। তিনি চাইতেন, আমরা যেন বড় হয়ে ভালো কিছু করি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য নিয়ে দুই ভাই একসাথে পড়াশোনা করেছেন। হান্নান ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে এবং মান্নান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে ভর্তি হন। আর্থিক সংকট মেটাতে হান্নানকে ঢাকায় টিউশনি করতে হয়েছে। কখনো একসাথে তিন থেকে চারটি টিউশনি সামলানোর পাশাপাশি গণরুমে গাদাগাদি করে থেকে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন তিনি। রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়েও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০১৮ সালে এইচএসসি পাসের পর দুই ভাইয়ের লক্ষ্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরিচিতি অনুষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে কে কী হতে চান।
স্নাতক পর্যায়েও হান্নান মেধার পরিচয় দিয়ে ৩ দশমিক ৯৫ সিজিপিএ পেয়ে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছিলেন। তার যমজ ভাই মান্নানও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুই ভাই সবসময় একে অপরকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন, কোনো বিষয় কঠিন মনে হলে একে অপরের সাথে আলোচনা করে তা সমাধান করতেন। মনে হয়েছিল, যখন বলেছি, তখন লক্ষ্যটি পূরণ করতেই হবে।
হান্নান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন তিনি প্রথম বর্ষেই সহপাঠীদের জানিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্য পূরণে তিনি এগিয়ে চলেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে পরিবেশবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। এখন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করছেন তিনি। সুযোগ পেলে নিজের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার আশা তার।
স্বর্ণপদক পাওয়ার খবরটি তিনি সবার আগে ভিডিও কলে মাকে জানিয়েছিলেন। খবরটি শুনে তার মা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পদকটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর মা ও মামারা হাতে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন। হান্নান শিক্ষকতার বেতনের একটি অংশ মায়ের কাছে পাঠান এবং ভবিষ্যতে মাকে নিজের কাছে রেখে যত্ন করার পরিকল্পনা তার। পরে পদকটি বাড়িতে নিয়ে গেলে মা ও মামারা সেটি হাতে নিয়ে দেখেন, খুশি হয়ে দোয়া করেন।
এই দীর্ঘ পথচলায় ট্রাস্টের বৃত্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন হান্নান। তিনি বিশ্বাস করেন, তীব্র প্রতিকূলতা থাকলেও লক্ষ্য স্থির থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তার এই অদম্য যাত্রায় ছোটবেলা থেকে নানা-নানি ও মামাদের সমর্থন তাকে মানসিকভাবে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
Leave a Reply