ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছে বিরোধী জোট। এই বিরোধী জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২টি এবং আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টি আসনে জয় পেতে পারে। এছাড়া আরব লিস্টের ঝুলিতে যেতে পারে ১৯টি আসন। আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে দেশটি। নেতানিয়াহুর কপালে কী আছে—ক্ষমতা, নাকি কারাগার। বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২ আসনে জিততে চলেছে। আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ৪৯ আসনে জিততে পারে। ইসরায়েলি আরব দলগুলোর জোট আরব লিস্ট জিততে পারে ১৯ আসনে। সামান্য এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কেউই। এসব অঞ্চল ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে। আইজেনকটের বেড়ে ওঠার গল্প নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠার গল্পের একেবারেই বিপরীত। আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয়ের কথা খুব কমই বলেন। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিচয়েরও ভূমিকা রয়েছে। ৯ ভাই–বোনের মধ্যে আইজেনকট দ্বিতীয়। আইজেনকট হতে পারলে তিনিই হবেন প্রথম। জীবনের বেশির ভাগ সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) কাটানোর পর রাজনীতিতে এসেছেন।
নির্বাচনী লড়াইয়ে আইজেনকটের প্রধান শক্তিগুলোর একটি হলো—তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নন। চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল–জাজিরা এ খবর দিয়েছে। নেতানিয়াহু জেরুজালেমের অভিজাত পরিবেশ ও ক্ষমতাবানদের বৃত্তের ভেতর বেড়ে উঠেছেন। সেখান থেকে উঠে এসে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লড়াইয়ে বিরোধীদের প্রধান প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে অনেক ভোটারের কাছে এটিই একটি বড় কারণ। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিবেরিয়াস ও ইলাতে অঞ্চলে বেড়ে ওঠা এই নেতা ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা মিজরাহি ইহুদিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান বৈষম্যের ধারক। এর আগে ইসরায়েলে কোনো মিজরাহি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হননি, আইজেনকট জয়ী হলে সেটি হবে নতুন ইতিহাস। আর ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটিতে অনেক ভোটারের কাছে তাঁকে ভোট দিতে হয়তো শুধু এই একটি কারণই যথেষ্ট। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইসরায়েলে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড ভোট, বেশি ভোটার উপস্থিতি কার পক্ষে যেতে পারে।
১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগ দিয়ে সামরিক ক্যারিয়ার শুরু করেন আইজেনকট।
দীর্ঘ ৪০ বছরের সামরিক জীবনে তিনি ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৫ সালে আইডিএফের চিফ অব স্টাফ হন এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর ২০২২ সালে বেনি গ্যান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে আসেন তিনি। ফলে রাজনীতিতে তিনি তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তাঁরা নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী সুনির্দিষ্ট কৌশল না থাকা এবং অস্পষ্টতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০২৪ সালের জুনে তাঁরা মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসেন।
ব্যক্তিগত জীবনে যুদ্ধ আইজেনকটের পরিবারের ওপর গভীর আঘাত হেনেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় লড়াইরত অবস্থায় তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল নিহত হন। এছাড়া যুদ্ধে তার দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান। ছেলের মৃত্যু তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও মতাদর্শকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক লেখায় তিনি বলেছিলেন, ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শপথ করেছিলেন যে তার আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবেন না। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় আইজেনকট লেখেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে ও তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, তা বৃথা যেতে দেব না।’।
আইজেনকট বর্তমানে ‘ইয়াশার’ পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ‘সোজা’। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে, যার বিরোধিতা করে আসছেন নেতানিয়াহু। এছাড়া সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি কট্টরপন্থী অর্থোডক্স দলগুলোর প্রভাবের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। এবার বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইয়াশার পার্টি।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে আইজেনকট কিছুটা রক্ষণশীল। তিনি গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমর্থক। আইডিএফের ‘দাহিয়েহ মতবাদ’-এর সাথে যুক্ত থাকার কারণে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগে বিশ্বাসী। তবে তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের কড়া সমালোচক। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং জিম্মিদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন।
গাজা প্রসঙ্গে আইজেনকটের প্রতিশ্রুতি হলো ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানো। নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে একই মনে হলেও, আইজেনকটের মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত হামাসও টিকে থাকবে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে নেতানিয়াহুকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন, যা আইজেনকটের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে জটিল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। এক বছর আগেও জনমত জরিপে তাঁর সমর্থন ছিল এক অঙ্কের ঘরে। জনমত জরিপের আগেই আভাস দেওয়া হয়েছিল, সরকার বা বিরোধী কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন না–ও পেতে পারে।
Leave a Reply