সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রেস উইংয়ের তথ্যানুযায়ী, এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছে প্রেস উইং।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কানাডার মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহায়তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের উপস্থিতি দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে, তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন অপরিহার্য। মায়ানমারে সংকটের উৎপত্তি ও সমাধানের কথা উল্লেখ করে কানাডার প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের গুরুত্বের বিষয়ে একমত পোষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা জানানো হয়। এ সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। তার সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও কারিগরি শিক্ষা প্রসারে কানাডা সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে কানাডাকে একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং দক্ষ নার্স তৈরির লক্ষ্যে নার্সিং প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রেও কানাডা সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। কৃষিখাতে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ সময় আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে চলমান কার্যক্রমের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে সার ও বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে এবং সরকারের কাছে তাদের সঠিক তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কানাডার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করতে পারলে দেশের অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নে কানাডা ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা।
সাক্ষাৎকালে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের দক্ষতা ও ইতিবাচক মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান। বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কানাডার পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার অজিত সিংসহ প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যবৃন্দও বৈঠকে অংশ নেন।
Leave a Reply