ভারতের সঙ্গে মর্যাদা, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সমমর্যাদার একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী বাংলাদেশ। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ আয়োজিত ‘আইডিয়া এক্সচেঞ্জ’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এ কথা বলেছেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কেবল অবকাঠামোগত বা বড় বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো প্রয়োজন। তার মতে, অতীতে দুই দেশের সম্পর্ক মূলত সরকার-কেন্দ্রিক বা রাষ্ট্রভিত্তিক ছিল, কিন্তু মানুষের মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবিক সম্পর্ক বুঝতে হলে আরও গভীরে কাজ করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, পারস্পরিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়া উচিত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও ঢাকার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট বলে জানান বিদায়ী হাইকমিশনার। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার মাত্র নয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৬শে ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম মাসেই দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে নির্বিঘ্ন যোগাযোগ শুরু হওয়া প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া ব্রিকস সম্মেলনসহ বিভিন্ন ফোরামে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের আলোচনার জন্য বাংলাদেশ বরাবরই প্রস্তুত ছিল।
শেখ হাসিনার সময়ে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের বিশেষ মাত্রাটি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্ভব কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াজ হামিদুল্লাহ কোনো কিছুকে আপেক্ষিক দৃষ্টিতে না দেখার পরামর্শ দেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি, রাষ্ট্রীয় বর্বরতা ও অর্থনীতি ধ্বংসের ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার বিষয়টিকে ভারতের যথাযথভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, হাজার হাজার আহত মানুষের হাসপাতাল ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের ওপর গুলিবর্ষণের মতো ঘটনার যথাযথ স্বীকৃতির অভাব সাধারণ বাংলাদেশিদের মনে গভীর আঘাত দেয়। সীমান্তে অনিয়মিত অভিবাসন বা পুশ-ইনের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সীমান্তে বিভেদমূলক পরিস্থিতি তৈরি দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করে। ঢাকা প্রতিটি ঘটনার যৌথ তদন্ত ও সমাধানের জন্য প্রস্তুত, কারণ মিথ্যা আখ্যান এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। হাজার হাজার আহত মানুষ এখনও হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন এবং বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুরা বুলেটের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে বা চোখ হারিয়েছে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডিসেম্বরে হতে যাওয়া এই ইস্যুটি আবেগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। বছরের সাত মাস পানির তীব্র সংকট ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার পলিমাটির ভার বহনের বাস্তবতায় পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক-কৌশলগত সমাধান জরুরি। এছাড়া বর্তমানে ভারত থেকে আদানির ১,৫০০ মেগাওয়াটসহ মোট ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে তার ভাষ্য, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে বাংলাদেশের তিন বাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে এবং এ নিয়ে প্রতিবেশীদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই। তিনি সীমান্ত সমস্যা, তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং ভিসা জটিলতাসহ নানা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। বছরের পাঁচ মাস বাংলাদেশে প্রচুর পানি এলেও বাকি সাত মাস কার্যত শুকিয়ে যায়।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্ট করেন, অন্যান্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতোই সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। তবে একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টি বাংলাদেশ ভুলে যায়নি, যা এ বছরের ২৫শে মার্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেপালের মতো ক্ষতিপূরণের দাবি তোলার প্রশ্নে তিনি জানান, কোপেনহেগেন থেকে ওয়ারশ সম্মেলন পর্যন্ত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশই সবসময় জোরালো ভূমিকা রেখেছে।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ১,৩০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। তবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, চিকিৎসা সেবা, পর্যটন, শিক্ষা ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে মোট অর্থনৈতিক কার্যক্রম ২,৮০০ থেকে ৩,০০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কেবল সংকীর্ণ নিরাপত্তার চশমায় না দেখে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও যৌথ প্রতিবেশ সুরক্ষায় সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
Leave a Reply