রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ন

কর্মজীবনে ব্যর্থতার গল্প সিভিতেও রাখা উচিত কেন?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২২ সময় দেখুন

সাধারণত সিভিতে আমরা নিজেদের যাবতীয় অর্জন, পুরস্কার, প্রশিক্ষণ ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা সুন্দরভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করি। বিপরীতে যেসব চাকরিতে আবেদন মঞ্জুর হয়নি, যেসব স্কলারশিপ বা প্রতিযোগিতায় প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে, সেগুলো আড়াল করে রাখা হয়। ফলে অন্যের জীবনবৃত্তান্তে শুধু সাফল্যের চকচকে ছবি দেখা গেলেও নিজের সিভিতে মনের অজান্তে ব্যর্থতার পাল্লাটাই ভারী মনে হয়। এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতেই অ্যাকাডেমিক ও করপোরেট বিশ্বে চালু হয়েছে ‘সিভি অব ফেইলিওরস’ বা ব্যর্থতার সিভির ধারণা। আর যত ব্যর্থতা, যেসব চাকরির আবেদন বাতিল হয়েছে, যে বৃত্তি পাইনি, যে প্রতিযোগিতায় বাদ পড়েছি, সেগুলো লুকিয়ে রাখি। যেন নিয়োগকর্তা কোনোভাবেই জানতে না পারেন। মনে হয়, অন্যরা বুঝি একের পর এক সুযোগ পেয়েই এগিয়েছে, শুধু আমিই বারবার ‘না’ শুনেছি। অথচ অন্যের সিভিতেও এমন অনেক ‘না’ থাকতে পারে। ধূসর টি-শার্ট থেকে বিলাসবহুল ফ্যাশনে, মার্ক জাকারবার্গের বদলে যাওয়া স্টাইল।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ ২০১০ সালের নভেম্বরে ‘আ সিভি অব ফেইলিওরস’ শীর্ষক এক নিবন্ধে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আনেন মেলানি স্টেফান। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এই পোস্টডক গবেষক যুক্তি দেন, গবেষণা ও পেশাগত জীবনে সাফল্য যেমন স্বাভাবিক, প্রত্যাখ্যানও তেমনই একটি বাস্তব ঘটনা। কিন্তু সেই ব্যর্থতার কোনো নথি না থাকায় তরুণদের মধ্যে অহেতুক হতাশা তৈরি হয়। তাই বাদ পড়া আবেদনগুলোর একটি দৃশ্যমান রেকর্ড রাখার তাগিদ দেন তিনি।

এর প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর, ২০১৬ সালে এই তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক ইয়োহানেস হাউসোফার। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে নিজের ব্যর্থতার সিভি প্রকাশ করেন। এতে যেসব ডিগ্রি প্রোগ্রামে তিনি সুযোগ পাননি এবং যেসব ফেলোশিপ, অনুদান বা অ্যাকাডেমিক পদ থেকে বাদ পড়েছিলেন, তার দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেন। তিনি লিখেছিলেন, তাঁর চেষ্টার বড় অংশই ব্যর্থতায় শেষ হলেও তা অলক্ষিত থেকে যায়, বিপরীতে শুধু সাফল্য দৃশ্যমান হয়। এই অসামঞ্জস্য দূর করার উদ্দেশ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যর্থতার এই তালিকাটিই তাঁর মূল অর্জনের চেয়ে বেশি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পায়। এই হিসাবটাকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ করতেই তাঁর এই উদ্যোগ।

অ্যাকাডেমিক জগতের গণ্ডি পেরিয়ে পেশাদারদের উদ্যোগেও ব্যর্থতা উদ্যাপনের পথ তৈরি হয়। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ক্যাস ফিলিপস ও ডায়ান লভিগলিও ‘ফেইলকন’ নামে একটি সম্মেলনের সূচনা করেন। প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতের উদ্যোক্তাদের এই আয়োজনে সফল উদ্যোগের বদলে কোনো ধারণাটি কেন ব্যর্থ হলো, ভুল সিদ্ধান্ত কোথায় ছিল—তা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হতো। প্রথম আসরেই এতে অংশ নেন চার শতাধিক পেশাজীবী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতিতেও আজকাল ব্যর্থতা নিয়ে কথা হচ্ছে।

তবে কয়েক বছরের মাথায় এই উদ্যোগের ধরণেই বড় পরিবর্তন ঘটে। ২০১৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ফেইলকন সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আয়োজকদের মতে, সিলিকন ভ্যালিতে ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল যে আলাদা সম্মেলনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ফেল ফাস্ট’ নীতি—যার অর্থ হলো, কার্যকর নয় এমন কোনো ধারণায় অযথা অর্থ ও সময় ব্যয় না করে দ্রুত তা পরীক্ষা করা এবং ব্যর্থ হলে দিক পরিবর্তন করা।

অবশ্য দ্রুত ব্যর্থ হয়ে শেখার এই ধারণার বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে। ১৯৮৯ সালেই পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পরিবেশ প্রকৌশলের অধ্যাপক জ্যাক ভি ম্যাটসন ‘ইন্টেলিজেন্ট ফাস্ট ফেইলিওর’ ধারণার ব্যাখ্যা দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে তিনি এ নিয়ে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ছোট স্কেলে পরীক্ষা চালিয়ে ঝুঁকি সীমিত রাখা এবং প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরের পদক্ষেপে যাওয়াই হলো বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ১৯৯১ সালে তিনি এ নিয়ে বইও লেখেন।

তবে সিভিতে ব্যর্থতার ইতিহাস তুলে ধরা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক সোনিয়া সোধা প্রশ্ন তোলেন, ব্যর্থতার সিভি প্রকাশের সাহস মূলত তাঁদেরই থাকে, যাঁরা ইতোমধ্যে সফল হয়ে গেছেন। কারণ তাঁদের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত সাফল্যের গল্পেই রূপ নেয়। কিন্তু যেসব ব্যর্থতার পর আর সাফল্য আসে না, তাদের গল্পগুলো আড়ালেই রয়ে যায়। সাফল্য নির্ধারণ করে কোনো মানুষ কোথায় পৌঁছেছেন, আর ব্যর্থতার ইতিহাস প্রকাশ করে সেই পথ চলায় তিনি কতগুলো কঠিন দরজায় আঘাত করেছিলেন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর