রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

যুব উন্নয়ন নিয়োগে প্রশ্ন ফাঁস

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২০ সময় দেখুন

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। প্রশ্নপত্র কার কাছ থেকে, কীভাবে চক্রের সদস্যদের হাতে পৌঁছেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র ও প্রমাণাদি জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১৬টি ১০০ টাকার স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি মূল শিক্ষাসনদ, ৪০ জনের স্বাক্ষর করা ব্যাংক চেকের পাতা এবং চেক বই রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রটি নিয়োগ প্রত্যাশীদের সঙ্গে সুপরিকল্পিতভাবে লিখিত চুক্তি করত। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রশ্নপত্রের জন্য চাকরিপ্রার্থীকে ১০ লাখ টাকা দিতে হতো। পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীর মূল শিক্ষাসনদ চক্রের জিম্মায় থাকত। যারা তাৎক্ষণিক টাকা দিতে পারতেন না, তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্যাংক চেক নেওয়া হতো। প্রতিটি চেকের বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে অংক লিখে রাখা হতো বলে জানিয়েছেন এসআরবি-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার শর্তে চক্রের সদস্যরা চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করতেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চক্রকে পুরো টাকা দেওয়ার পরই সনদ ফেরত পেতেন প্রার্থীরা। এসআরবির আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাক্ষরসহ অন্তত ৪০ জন চাকরিপ্রার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকার ব্যাংক চেক নিয়েছেন চক্রের সদস্যরা।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের অন্য দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। গতকাল আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরো প্রক্রিয়ায় এনবিআর কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মুঠোফোনে নূর মোহাম্মদের কাছে প্রশ্নের অস্পষ্ট ছবি আসে। এরপর সকাল সোয়া ছয়টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পান কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর চক্রটি উত্তরপত্র তৈরি করে এবং তা ছড়িয়ে দেয়। ফাঁস হওয়া সেই উত্তরের বিনিময়েই ছিল ১০ লাখ টাকার এই বিশাল লেনদেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাত কাটাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। এনবিআরের কর্মচারীদের হাত ঘুরে ছড়ায় উত্তরপত্র। পরে তাঁদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায় উত্তরপত্র।

উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে অংশ নেওয়ার জন্য ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন প্রার্থী যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষার মাত্র পৌনে এক ঘণ্টা আগে, সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়।

এই ঘটনায় পরদিন ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় এটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ নিশ্চিত করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা মীর্জা মোহাম্মদ মুক্তা জানিয়েছেন, রোববারই মামলার নথি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে ঘটনাটি তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গত শনিবার পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এদিকে, এই ঘটনার মধ্যেই গত শুক্রবার নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এনবিআরের কর্মীদের সম্পৃক্ততা ও চক্রের অন্যান্য সদস্যদের বিষয়ে ছায়া তদন্ত অব্যাহত রেখেছে এসআরবি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর