মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন

দিল্লির রাজপথে তরুণদের বিক্ষোভে মোদি শাসনের শেষ ইঙ্গিত

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩০ সময় দেখুন

প্রবাদ আছে, ধীরে ধীরে একটি মুরগির পালক উপড়ে ফেললে তা অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় না। এই কৌশলে ছোট ছোট অন্যায় ও অনিয়মগুলো দীর্ঘকাল চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে অনেকে ভুল করেন। তবে শেষ পর্যন্ত সব সত্য একদিন কোনো আড়াল ছাড়াই নগ্নরূপে সামনে চলে আসে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এখন অনেকটা সেই পালকহীন মুরগির অবস্থার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিক অবক্ষয়ের প্রতিবাদে দেশটির তরুণ প্রজন্ম এখন রাজপথে নেমেছে এবং কৌতুক করে নিজেদের ‘ককরোচ’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। প্রবাদ আছে, যদি একটি মুরগির গায়ের পালক এক এক করে উপড়ে ফেলা হয়, তবে চট করে কেউ তা টের পায় না। অনেকেই এই বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে ছোট ছোট অন্যায় বা অনিয়ম হয়তো কখনোই তাঁদের পেছনে তাড়া করে ফিরবে না। কিন্তু এই কৌশলের প্রধান সমস্যা হলো, এক সুন্দর সকালে সব সত্য কোনো রকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছাড়াই একদম উলঙ্গ রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, যা আর অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না। তাঁর সরকার দেশজুড়ে যেসব কঠোর পদক্ষেপ জারি করেছে, তা যেন আশির দশকের সেই জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।

নরেন্দ্র মোদির বর্তমান কোণঠাসা অবস্থা হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত ১২ বছর ধরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ধারাবাহিক আঘাত এবং জনমতের তোয়াক্কা না করার পরিণামই আজ সামনে এসেছে। গত ১০ অক্টোবর ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দিল্লির রাজপথে যে বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা মোদির শাসনপদ্ধতি ও ভুলগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। এই দিনটির আন্দোলন কেবল একটি সূচনা মাত্র বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নরেন্দ্র মোদি নিজেকে আজ যেভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন, সেনা-পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে আত্মরক্ষা করছেন এবং যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন—যাঁদের কাছে গণতন্ত্রের এই তিলে তিলে ধ্বংসের পর হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, ভয় পাওয়ারও কিছু। 12.

বিক্ষোভের দিনে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলায় মেতেছিল। নির্ধারিত স্থানে যেতে বাধা দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে সমবেত হয়েছেন। সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যেও তারা রাজপথ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। দিনভর চালানো এই অভিযানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য তাদের অনেককেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীজুড়ে এক জায়গা থেকে হটিয়ে দিলে আন্দোলনকারীরা অন্য কোনায় গিয়ে আবার একত্র হয়েছেন—নির্ধারিত স্থান থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়া হলেও তাঁরা কোনোভাবেই রাজপথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না।

এই আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে এবং ধ্রুব রাঠির মতো পরিচিত মুখদের সমাবেশ শুরুর আগেই আটক করা হয়েছে। এছাড়া মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ বহু অধিকারকর্মীকেও আটক করার ঘটনা ঘটেছে। একদিকে পুলিশের ব্যারিকেড ও দমন-পীড়ন, অন্যদিকে তরুণ শিক্ষার্থীদের অকুতোভয় অংশগ্রহণ—পুরো দৃশ্যপটই মোদি সরকারের নড়বড়ে রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। পুরো ভারতজুড়ে একের পর এক শহরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে।

ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়; বরং প্রকাশ্যে প্রশ্ন উঠছে মোদির প্রধানমন্ত্রী থাকার যোগ্যতা নিয়ে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে, যেখানে বর্তমান সরকারকে গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংসের জন্য দায়ী করা হয়েছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের নামে ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিন্যাস’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াটি মূলত ১৩ কোটি ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।

এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না করা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে যখন ২০০৬ সালের একটি পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। এই সমস্ত ঘটনা মোদি সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনাস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে বয়স্ক ও সংঘাতপ্রিয় মন্ত্রীদের নীতি, অন্যদিকে তরুণদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর—এই দুই মেরুর অবস্থানেই আজ ভারত দাঁড়িয়ে আছে।

মোদি প্রশাসন অতীতে বিভাজন ও ঘৃণা ছড়ানোর যে কৌশল ব্যবহার করেছে, তা আজ তাদের নিজেদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার ভান করলেও বাস্তবে সরকার কেবল সংঘাতের জন্ম দিয়েছে, যা এখন দিল্লিকে এক দুর্গের মতো অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। তবে এই আন্দোলন কেবল ১০ অক্টোবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আগামী দিনগুলোতে মোদির সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতিহাস হয়তো নরেন্দ্র মোদিকে এমন একজন শাসক হিসেবে মনে রাখবে, যার আমলে একটি পুরো প্রজন্ম শাসনব্যবস্থা, সেনাবাহিনী ও দিল্লি পুলিশের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছিল। দেশের গণতন্ত্র যে ভেতর থেকে কতটা কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে, তা তরুণদের এই অবাধ্যতা ও সাহসের মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

নয়াদিল্লি এখন এক অস্থির বর্তমান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই ঝড়ের ধুলা একসময় থিতু হলেও, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তার উত্তর আজ রাজপথে নেমে আসা এই তরুণদের হাতেই নিহিত। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা যে জনগণের হাতেই ন্যস্ত, সেই সত্যটিই এই আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর