মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন

সর্বকালের সেরা ১০ সিনেমার আয়ের রহস্য: কেন ব্লকবাস্টার হয় এসব ছবি?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ সময় দেখুন

হলিউডের ইতিহাসে ব্লকবাস্টার সিনেমা তৈরির লক্ষ্য দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জস’ সিনেমা উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ১০ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। তখন থেকেই বড় বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাজারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আয় নিশ্চিত করা। তবে একটি সিনেমা কীভাবে শত কোটি ডলারের ব্যবসা করে, তার কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র নেই।

ফোর্বসের বিনোদনবিষয়ক লেখক টিম ল্যামারস ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বিশ্বখ্যাত সিনেমাগুলোর সাফল্যের মূলে রয়েছে দুটি শক্তিশালী স্তম্ভ—দর্শকের আবেগ ও গল্পের চমৎকার মেলবন্ধন এবং জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি বা চিরচেনা চরিত্রের আকর্ষণ। মুদ্রাস্ফীতি বা টিকিটের দাম সমন্বয় না করে দেখা গেছে, সর্বকালের শীর্ষ ১০টি সিনেমার মধ্যে আটটিরই আয় ২০০ কোটি ডলারের বেশি, বাকি দুটিও এই রেকর্ডের খুব কাছে অবস্থান করছে। বাকি দুটি ছবিও সেই মাইলফলকের খুব কাছাকাছি। টিকিটের বাড়তি দাম দিয়েও দর্শকেরা সিনেমাটি দেখতে আগ্রহী হয়েছিলেন। শ্রেণিবৈষম্য, প্রেম, বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর মতো সর্বজনীন আবেগ ছবিটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

বর্তমানে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’, যার আয় ২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। এরপরই রয়েছে ২০০৯ সালের ‘অ্যাভাটার’ (২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার), ২০২৬ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার), ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার), ‘নে ঝা ২’ (২২৭ কোটি ডলার) এবং ১৯৯৭ সালের ‘টাইটানিক’ (২২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার)। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ (২০১৯)—২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯)—২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২০২৬)—২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২০২২)—২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ‘নে ঝা ২’ (২০২৫)—২২৭ কোটি ডলার। 2019, 294, 10, 2009, 292, 30, 2026, 251, 90, 2022, 233, 40, 2, 2025, 227, 1997, 226, 2015, 207, 2018, 205, 20. ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ (২০২১)—১৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘জুটোপিয়া ২’ (২০২৫)—১৮৭ কোটি ডলার। প্রথম ছবির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সিক্যুয়েলটিও বিশ্বব্যাপী ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। বিশ্বব্যাপী ২২৭ কোটি ডলার আয় করা ছবিটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে চীনের বাজার থেকে। মোট আয়ের প্রায় ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারই এসেছে দেশটি থেকে।

‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ সিনেমার সাফল্যের মূল কারণ ছিল দর্শকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা। বড় পর্দায় নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম হয়েছিল ছবিটি।

২০০৮ সালে ‘আয়রন ম্যান’ দিয়ে শুরু হওয়া এই মহাকাব্যিক গল্পের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকেরা প্রিয় চরিত্রগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ২০১৮ সালের ‘ইনফিনিটি ওয়ার’-এর শেষে থানোসের আঙুলের এক চুটকিতে মহাবিশ্বের অর্ধেক প্রাণের বিলীন হওয়ার ঘটনার পর, প্রিয় চরিত্রদের হারিয়ে যাওয়া এবং তাদের উদ্ধারের আবেগঘন লড়াই দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেছিলেন অগণিত ভক্ত। যদিও ২০২৪ সালে মার্ভেল জানিয়েছে, অ্যাভেঞ্জারদের ফেরার পালা শুরু হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরিয়ে আনতে অ্যাভেঞ্জাররা শুরু করে সময়ভ্রমণের এক বিপজ্জনক অভিযান। যদিও ২০২৪ সালে মার্ভেল ঘোষণা দেয়, আবারও ফিরছেন অ্যাভেঞ্জাররা।

জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ তার ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি এবং প্যান্ডোরা গ্রহের চোখধাঁধানো দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। ১৩ বছর পর এর সিক্যুয়েল ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ মুক্তি পেয়ে ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। ক্যামেরন এমন একজন নির্মাতা, যার পরিচালনায় তিনটি সিনেমা (টাইটানিক, অ্যাভাটার ও এর সিক্যুয়েল) ২০০০ কোটি ডলারের বেশি আয়ের রেকর্ড গড়েছে।

তালিকায় ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা যায় ১৯৯৭ সালের ‘টাইটানিক’। এটি সুপারহিরো বা ফ্যান্টাসি ঘরানার বাইরে একটি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেটের দুর্দান্ত অভিনয় এবং সর্বজনীন প্রেমের গল্পের কারণে ১১টি অস্কারজয়ী এই সিনেমাটি দীর্ঘসময় ধরে শিল্প ও বাণিজ্যের অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। এছাড়া চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’ (২০২৫) চীনা পুরাণের জনপ্রিয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে ২২৭ কোটি ডলার আয় করে দেখিয়েছে যে, আঞ্চলিক লোকগাঁথাও বিশ্বজুড়ে সফল হতে পারে। রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ক্রিস ইভানস, ক্রিস হেমসওয়ার্থ ও স্কারলেট জোহানসনের মতো তারকারা অভিনয় করেছেন এতে। নাভি জনগোষ্ঠীর সদস্য নেইতিরির প্রেমে পড়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থাৎ হলিউডের বাইরের একটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পুরাণভিত্তিক অ্যানিমেশনও যে বিশ্ব বক্স অফিসে বড় সাফল্য পেতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ‘নে ঝা ২’। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট অভিনীত ছবিটিতে জ্যাক ও রোজের প্রেমের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯১২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের মর্মান্তিক ঘটনা।

বক্স অফিসের শীর্ষ ১০ সিনেমার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টাইটানিক বাদে বাকি নয়টিই কোনো না কোনো পরিচিত ঘরানা কিংবা প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশ। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে নতুন কোনো গল্পের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজি এগিয়ে নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। এর মধ্যে সুপারহিরো সিনেমার আধিপত্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যার মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ ও ‘স্পাইডার-ম্যান’ সিরিজের ছবিগুলো। কাল্পনিক গ্রহ প্যান্ডোরার পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে দেখা যায়, সাবেক সেনাসদস্য জেক সালি সেখানে গিয়ে এক ভিন্ন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। পৃথিবীর মানুষের লোভ ও প্যান্ডোরার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়ান তিনি। এবার প্যান্ডোরার জলজ পরিবেশ ও মেটকায়িনা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এগিয়েছে গল্প। কারণ, অন্য ছবিগুলোর অধিকাংশই কল্পবিজ্ঞান, সুপারহিরো কিংবা ফ্যান্টাসিনির্ভর।

তবে শুধু নাম বা ফ্র্যাঞ্চাইজি থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না; দর্শকের সঙ্গে গল্পের আবেগের সংযোগ সবচেয়ে জরুরি। দর্শক যখন পর্দার চরিত্রের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন, তখনই সিনেমাটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং দ্বিতীয়বার দেখার আগ্রহ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর পর সুপারহিরো সিনেমা নিয়ে দর্শকদের আগ্রহে ভাটা পড়ার প্রবণতা দেখা গেছে, যা ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ নামে পরিচিত। মার্ভেল স্টুডিওর বেশ কিছু সিনেমা আগের সাফল্য ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। যেমন, ২০২২ সালে ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ ৯৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার এবং ‘ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার’ ৮৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার আয় করেছে, যা আগের ব্লকবাস্টারগুলোর তুলনায় কম। এখন মার্ভেলের সব আশা ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’-তে, যেখানে পুরনো অ্যাভেঞ্জারদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

বড় বাজেটের সিনেমা বা জনপ্রিয় তারকাই সাফল্যের শেষ কথা নয়। ২০২৬ সালে টম ক্রুজ অভিনীত ‘ডিগার’ বক্স অফিসে ব্যর্থতা তার একটি উদাহরণ। বিপরীতে, কম বাজেটের হরর ছবি ‘বাকরুমস’, যার নির্মাণ ব্যয় ছিল মাত্র ১ কোটি ডলার, বিশ্বজুড়ে ৪০ কোটি ডলার আয় করে চমক দেখিয়েছিল। এর প্রথম সপ্তাহান্তেই ১ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করা সিনেমাটি উত্তর আমেরিকায় ২৬ কোটি ৩৪ লাখ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ২৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলার আয় করে। অর্থাৎ, বড় বাজেটের ঝুঁকি না নিয়েও উদ্ভাবনী কৌশলে বক্স অফিসে বাজিমাত করা সম্ভব।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর