সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৬ অপরাহ্ন

তিন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিয়ে কেন তোলপাড়, কী বললেন আলোকচিত্রী?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২২ সময় দেখুন

২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত আমেরিকান ‘ভোগ’, ‘এল’ এবং ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদগুলো ফ্যাশন জগতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি প্রচ্ছদেই তিনজন তারকাকে দেখা গেছে, তবে তাদের ছবিগুলো দেখে মনে হতে পারে একই শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। এই তিনটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেই আলোকচিত্র হিসেবে কাজ করেছেন হাঙ্গেরির ফ্যাশন ফটোগ্রাফার সিলভেস্তার মাকো। এইচএসসি পাস করে ঝালমুড়ির ব্যবসা, এখন মাসে আয় এক লাখ টাকা। ৭ মাসে ৩৭ কেজি ওজন কমিয়ে র‍্যাম্পে ফিরেছেন মডেল মাশিয়াত, কীভাবে সম্ভব করলেন। তিনটি ছবি পাশাপাশি রাখলে মিলগুলো সহজেই চোখে পড়ে। কার্টুন ও মিম বানিয়ে ফেসবুকে দিয়ে ‘কোটি টাকার ব্যবসা’ করেছেন দুই ভাই। মাকো একসময় চিত্রশিল্পী হতে চেয়েছিলেন।

‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছেন ২৪ বছর বয়সী অভিনেত্রী জেনা ওর্তেগা। অন্যদিকে, ‘এল’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ সাজানো হয়েছে ২৮ বছর বয়সী অভিনেত্রী ও মডেল হান্টার শেফারের ছবি দিয়ে। এছাড়া ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ তাদের ডিজিটাল প্রচ্ছদে সুপারমডেল জিজি হাদিদের ছবি প্রকাশ করেছে।

এই প্রচ্ছদগুলো প্রকাশের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং ফ্যাশন মহলে তীব্র কৌতূহল ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাগাজিনের ছবিতে কেন এত মিল। মূলত এই ছবিগুলোতে ‘পেইন্টারলি অ্যাসথেটিক’ বা চিত্রকলার মতো আবহ ব্যবহার করা হয়েছে। আলোকচিত্র হওয়ার পরেও এগুলোতে আলো-ছায়ার এমন কারুকাজ ও সেট ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেখে মনে হয় এগুলো কোনো বাস্তব ছবি নয়, বরং কোনো শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম।

এই ধরনের ফটোগ্রাফিতে রেনেসাঁ যুগের চিত্রকলার প্রভাব স্পষ্ট। মাকোর তোলা প্রতিটি ছবিতেই নাটকীয়তা, ধ্রুপদি সৌন্দর্যবোধ এবং রঙের বিন্যাসে এক ধরনের সামঞ্জস্য দেখা যায়। জেনা ওর্তেগার ছবিতে ডিওর ব্র্যান্ডের পোশাক ও বাদামি ফ্রেকলস বা ত্বকের ছোপগুলো পুরোনো দিনের প্রতিকৃতির আবহ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পটভূমিতে ‘ট্রম্প লয়েল’ কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে গভীরতার এক বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের ছবিতে আলোছায়া, রং, পোশাক, পটভূমি ও মডেলের ভঙ্গি এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে পুরো দৃশ্যটি চিত্রকর্মের মতো দেখায়। ইউরোপে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত রেনেসাঁ যুগের চিত্রকলায় মানুষের অবয়ব, পোশাক, আলো-ছায়া ও দৃশ্যের গভীরতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সাদা পোশাক, বেগুনি পটভূমি আর নাটকীয় সাজে তাঁকে যেন কোনো পুরোনো চিত্রকর্মের চরিত্র মনে হয়। মুখে হালকা মেকআপ, ত্বকে দৃশ্যমান ছোট ছোট বাদামি ছোপ বা ফ্রেকলস। পুরো ছবিতে একধরনের কোমল অথচ নাটকীয় সৌন্দর্য। সঙ্গে ব্যাগ ও বোনা কাপড়ের তৈরি দুটি ইঁদুর আকৃতির খেলনা। সিলভেস্তার মাকোর ছবিতে মডেল শুধু সুন্দর পোশাক পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান না; বরং পুরো দৃশ্যই হয়ে ওঠে একটি শিল্পকর্ম।

অন্যদিকে, হান্টার শেফারের ছবির গাঢ় পটভূমি এবং জিজি হাদিদের পালকসজ্জিত পোশাক ও কাঠের টুলের ব্যবহার ছবিগুলোকে বাস্তব ও কল্পনার মাঝামাঝি এক অবস্থানে নিয়ে গেছে। জিজি হাদিদের এই ডিজিটাল প্রচ্ছদটি ১৫ অক্টোবর সবার আগে প্রকাশিত হয়েছিল, এরপর আসে হান্টার শেফারের প্রচ্ছদ এবং ২২ অক্টোবর জেনা ওর্তেগার প্রচ্ছদটি প্রকাশ পায়।

এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি ভিন্ন বড় প্রকাশনায় একই ধরনের কাজের ধরন দেখে ফ্যাশন সমালোচকরা কিছুটা অবাক হয়েছেন। ‘পেজ সিক্স’ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্যাশনজগতের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাগাজিনগুলোর সম্পাদকীয় দলকে এই বিষয়টি আগে থেকে জানানো আলোকচিত্রীর নৈতিক দায়িত্ব ছিল।

তবে জিজি হাদিদের ফটোশুটের সঙ্গে জড়িত একটি সূত্র দাবি করেছে, তাদের কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছিল মার্চ মাসে এবং শুটিং সম্পন্ন হয় জুলাই মাসে। সূত্রটির মতে, ছবিগুলোর এই সাদৃশ্য আসলে কোনো নকল বা নতুনত্বের অভাব নয়, বরং এটি আলোকচিত্রী সিলভেস্তার মাকোর নিজস্ব স্বতন্ত্র শৈলীর প্রতিফলন মাত্র।

আধুনিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতে বর্তমানে বড় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

আগে ম্যাগাজিনগুলো নির্দিষ্ট আলোকচিত্রীদের ওপর নির্ভর করত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।

অনেক নামী ফটোগ্রাফার স্বাধীনভাবে কাজ করায় একই সময়ে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাগাজিনে তাদের কাজ প্রকাশিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তাছাড়া প্রকাশনাগুলোর বাজেট হ্রাস পাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে একই ফটোগ্রাফারকে বারবার নিয়োগের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা একটি প্রকাশনা বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্যই কাজ করতেন। প্রকাশনার বাজেট কমে আসাও এই পরিবর্তনের একটি কারণ বলে মনে করেন ফ্যাশনজগতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নির্দিষ্ট আলোকচিত্রীকে একান্তভাবে ধরে রাখার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করানো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক।

আলোকচিত্রী সিলভেস্তার মাকো মূলত তার পরাবাস্তব দৃশ্য নির্মাণ এবং হাতে তৈরি সেটের জন্য পরিচিত। তিনি ডিজিটাল প্রযুক্তির চেয়ে বাস্তব উপকরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন, যা তার কাজকে অনন্য করে তোলে। তবে এই জনপ্রিয়তা এখন একটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে যে, একই শিল্পীর শৈলী কতবার ব্যবহার করলে তা নতুনত্ব হারাবে এবং প্রতিটি ম্যাগাজিন তার নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখতে পারবে কি না—তা এখন বড় প্রশ্ন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর