জার্মানিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা পুনরায় চালুর সম্ভাবনার প্রতিবাদে জেন-জি তরুণদের আয়োজিত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে, অন্যদিকে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে উগ্রপন্থীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে জার্মান সরকার।
‘জেন জি হ্যাজ গট দিস!’ ব্যানারে শনিবার জার্মানির বিভিন্ন শহরে এই কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবির মধ্যে ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর উদ্যোগ বন্ধ করা। আয়োজকরা কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানালেও ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলনসহ কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রাঙ্কফুর্টে জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের পাশাপাশি দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। অস্ত্রের দোকানের জানালা ভাঙার অভিযোগে এক সন্দেহভাজনকে আটকের পর দুটি অস্ত্র জব্দ করে পুলিশ। ডার স্পিগেলের তথ্যমতে, রাত পর্যন্ত শহরটিতে ত্রিশের বেশি ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। রাত পর্যন্ত শহরটিতে ৩০ জনের বেশি ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট সংবাদমাধ্যম বিল্ডকে জানান, বামপন্থী সহিংস গোষ্ঠী এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু বিশৃঙ্খলাকারী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের অন্তর্ভুক্ত হেস রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেকও বিক্ষোভে উগ্রপন্থীদের অনুপ্রবেশের কথা জানিয়ে বলেন, শহরটিতে প্রায় একশ জন বামপন্থী উগ্রবাদীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার দাবি, শহরটিতে প্রায় ১০০ জন বামপন্থী উগ্রবাদীকে শনাক্ত করা হয়েছে। হেসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেক বলেন, ‘ফ্রাঙ্কফুর্টে এই আয়োজনের এমন পরিণতি সত্যিই লজ্জাজনক।’।
সন্ধ্যার দিকে তাদের তৎপরতায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি জার্মানিতে তৈরি হতে দেবেন না উল্লেখ করে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ফ্রান্সে লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন এবং পুলিশের ওপর হামলার যে দৃশ্য দেখা গেছে, সেটিকে কোনোভাবেই আদর্শ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
কোলন শহরেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিলের সময় কয়েকজন আতশবাজি ফোটালে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ জানায়, তাদের পদক্ষেপ কেবল বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে ছিল, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নয়। হামবুর্গে ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া ছাড়াও জরুরি সেবাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। রাজধানী বার্লিনে ২৭ জন পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন এবং সম্পদ ভাঙচুর ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ৬০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সহিংসতার এই ঘটনার পর আয়োজকরা নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন। ডার স্পিগেলের প্রতিবেদনে তাদের সংবাদমাধ্যম বিষয়ক দলের মুখপাত্রের বক্তব্য তুলে বলা হয়, বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর কী ঘটেছে, তার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। হ্যালোইন উৎসবের দিনটিকে কাজে লাগিয়ে প্রচার বাড়াতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সারা জার্মানিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন বলে দাবি করা হয়েছে। মিউনিখের এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগের কোনো জবাব নেই এবং তারা শুধু বাজেট কাটছাঁট করছে। ড্রেসডেনের বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ধনীরা যুদ্ধ চায়, তরুণেরা ভবিষ্যৎ চায়। আন্দোলনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘আমরা এমন তরুণ, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই অন্যদের সিদ্ধান্ত নিতে দেখতে আর রাজি নই।’। কেন আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, সে বিষয়ে মিউনিখের ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগের বিষয়ে সরকারের কোনো জবাব নেই। আরেকটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তোমরা সবকিছু গণ্ডগোল করেছ—এবার জেন-জিই সব ঠিক করবে।’।
এদিকে জার্মানির পাশাপাশি শনিবার ফ্রান্সেও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের ব্যানারে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ১৭ ও ২৪ অক্টোবরের কর্মসূচির পর এটি ছিল তৃতীয় দফার বিক্ষোভ। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, যার মধ্যে প্যারিসেই ছিলেন ৭০ হাজার। এর আগে ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ৫ লাখ ৫০ হাজার এবং গত সপ্তাহে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও বোর্দো, তুলুজ, রেন, লিল, নঁত, মার্সেই ও লিওঁসহ কয়েকটি শহরে মিছিলের শেষভাগে উগ্রপন্থিরা ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টা চালান।
অন্যদিকে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শনিবার পর্তুগাল ও ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। পর্তুগালের লিসবনে হাজারো মানুষ মিছিল করে মধ্য-ডানপন্থী সরকারের প্রস্তাবিত ভাড়া আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা, এই আইন কার্যকর হলে আবাসন সংকট আরও তীব্র হবে। পাশাপাশি ইতালির তুরিন, বোলোনিয়া ও মিলানসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকরা মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা এবং অসহনীয় আবাসন ব্যয়ের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছেন।
Leave a Reply