রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কি আবারও হামলা চালাবেন ট্রাম্প?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ সময় দেখুন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতিতে এক ধরনের অস্পষ্টতা ও স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে তিনি যুদ্ধের অবসানে সমঝোতার পথ অনেক দূর এগিয়েছে বলে দাবি করছেন, অন্যদিকে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত হামলার হুমকিও দিয়ে যাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে এমন দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছেন। তবে আফগাহি সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প এখনো যুদ্ধের পক্ষে থাকা একদল কট্টরপন্থির মধ্যে রয়েছেন।

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ে নিজ দেশের জনগণের অসন্তোষের বিষয়টিকে ট্রাম্প পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি এও বলেন যে, এমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ তিনি শেষ পর্যন্ত নেবেন কি না, তা খুব দ্রুতই জানা যাবে। তবে এই যুদ্ধের হুমকির পাশাপাশি তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির কথা বারবার উল্লেখ করছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং বর্তমানে দুই পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী বলে জানালেও এর বিস্তারিত কোনো রূপরেখা প্রকাশ করেননি তিনি। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো—এখন সেটিই তার বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তবে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি চললেও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই।

ইরানের কেশব দ্বীপে শুক্রবার নতুন করে সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যমতে, দ্বীপটির সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। এই অঞ্চলটি ইরানের অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন এই দ্বীপে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। সোমবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা এপি-কে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সাতটি দাবি পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব শর্ত মেনে নেওয়ার পরই কেবল নতুন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত হবে। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ভূগর্ভস্থ স্থাপনাও রয়েছে, যেগুলোকে ‘মিসাইল সিটি’ বলা হয়। তথ্যদাতাদের প্রয়োজনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলাকে ট্রাম্প ‘ছোটখাটো’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান দাবি করেছে, তাদের সেনাবাহিনী কেশব দ্বীপের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে।

এদিকে, এই দ্বীপগুলোতে বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেন্টকম জানিয়েছে, সেখানকার পরিস্থিতি আপাতত শান্ত।

তবে ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। এ কর্মসূচির আওতায় দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এই আশঙ্কা থেকেই স্থাপনাগুলোর আশেপাশের বাসিন্দাদের মাঝে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ করছে তেহরান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পারমাণবিক বিকিরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুদ্ধের সময় দুই থেকে তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মানুষদের কাছে এসব ট্যাবলেট পৌঁছে দেওয়া হয়। পারমাণবিক বিকিরণের প্রভাব থেকে থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুরক্ষা দিতে এসব ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি ইরানের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর শহরের বাসিন্দাদের মাঝেও আয়োডিন বিতরণ চলছে, যেখানে ইরানের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবস্থিত। পরিস্থিতি যখন এমন উত্তেজনাপূর্ণ, তখন শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যের বিনিময়ে সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। এই দুই পরিস্থিতি তাকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে। এই শহরেই ইরানের একমাত্র সচল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য ইরানের কৌশল এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর গ্যারান্টি। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ানের মতে, ইরান তাদের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের মাধ্যমে ট্রাম্পকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, সীমিত পরিসরে হামলা চললেও এর শেষ কোথায় হবে, তা ট্রাম্পের কাছে স্পষ্ট নয়। তাই তিনি সম্মানজনকভাবে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের যেসব দাবি রয়েছে, তা থেকে তেহরান সরে আসতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। প্রথমটি বেছে নিলে তার এত দিনের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। আর হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী ক্ষোভ আরো বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সংঘাতে তাদের বিকল্পও সীমিত হয়ে এসেছে। সাবেক ইরানি কূটনীতিক হাদি আফগাহি আলজাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রও নমনীয় হলে সমঝোতার পথ সহজ করতে পারে তেহরান। একই সঙ্গে ইরানকে নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যেও মতবিভক্তি তৈরি হয়েছে।

এদিকে, শনিবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার দাবিটি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এসব প্রচারণা কেবল যুদ্ধের মেয়াদ বাড়াতে চায় এমন পক্ষগুলো ছড়াচ্ছে। এর আগে শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তিনি যুদ্ধের জন্য ‘নিখুঁত মুহূর্তের’ অপেক্ষায় বসে না থাকতে দুই পক্ষকে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রচারণা শুধু তাদেরই উপকারে আসে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।

ট্রাম্পের এই দ্বিধা সত্ত্বেও সেন্টকম ইরানে বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে এর জবাব হবে অনেক বড়। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্কিন হামলায় সহায়তা করবে এমন যেকোনো দেশেও পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত ইরান। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের নেটওয়ার্ক ও এআই স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত রেখেছে বলে জানায় উভয়পক্ষ। পাহাড়টির নিচে বিশাল সুড়ঙ্গ ও বিভিন্ন স্থাপনার একটি জটিল নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ অনিশ্চয়তাই তার ব্যক্তিগত দ্বিধা বাড়াচ্ছে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর