ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ভয়াবহ মানবিক সংকটের মাঝে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে ২৫০টি ফিলিস্তিনি যুগলের গণবিয়ে। গত ৬ নভেম্বর শুক্রবার গাজা সিটির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে মেরিন ক্লাব প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ‘অপারেশন শিভালরাস নাইট-৩’-এর আওতায় ‘থৌব আল ফারাহ-৩’ বা আনন্দের পোশাক শীর্ষক বিশেষ উদ্যোগ থেকে এই আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ৫০০ বর-কনেকে স্বাগত জানাতে হাজারো স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ভিড় করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন ৫০০ বর-কনে। সাজানো গাড়িতে করে নবদম্পতিরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে তাদের স্বাগত জানান স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে সংগীত ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয় বিয়ের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন বর তাদের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেন। এর আওতায় খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, আশ্রয় উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গণবিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য মোট ১১ হাজার ৬২২ জন আবেদন করেছিলেন। স্বচ্ছতার সঙ্গে যাচাই-বাছাইয়ের পর লটারির মাধ্যমে ১ হাজার ৩৩৫ জনকে চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য রাখা হয়, সেখান থেকে ২৫০ জন বরকে নির্বাচন করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে কনেরা ঐতিহ্যবাহী সাদা পোশাকে এবং বরদের অনেকেই গাঢ় রঙের স্যুটের সঙ্গে ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের প্রতীক কেফিয়াহ পরিধান করেন। বিয়ের পরবর্তী সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মেতে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। সেখান থেকে ২৫০ জন বরকে বেছে নেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে ২৫০ কনের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যুদ্ধের কারণে গাজার অসংখ্য তরুণ-তরুণীর বিবাহিত জীবন শুরু করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
ঘরবাড়ি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং চরম আর্থিক সংকটে অনেক পরিবার বিয়ের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম ছিল। এই গণবিয়ে নবদম্পতিদের আর্থিক বোঝা কমিয়ে নতুন জীবন শুরুর সুযোগ করে দিয়েছে। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা সাঈদ আল-নাজ্জার জানান, হামলায় তার ভিটেমাটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং এখন তাঁবুতেই বসবাস করছেন তিনি। মুহাম্মদ কুওয়াইদির নামে আরেক বর জানান, ঘরবাড়ি হারিয়ে নতুন সংসার গড়ার সামর্থ্য নেই, তাই বিয়ের পরও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁবুতেই থাকতে হবে তাদের। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় থাকবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা তাঁবুতেই থাকবেন।
এত কষ্টের মধ্যেও এই আয়োজনকে বেঁচে থাকার লড়াই ও আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক মাধ্যমে জানান, বিশ্বের মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে থাকলেও গাজার মানুষ তাদের মানবিক সহায়তার প্রধান অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। মানবিক সহায়তার লক্ষ্য শুধু মানুষের দুর্দশা কমানো নয়, বরং তাদের মুখে হাসি ফোটানো ও সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বিয়ের আনন্দকে জীবনের প্রতি ফিলিস্তিনিদের ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার প্রত্যয়ের প্রতীক হিসেবে দেখছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, গাজায় সহায়তার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর শুরু হয় ‘অপারেশন শিভালরাস নাইট-৩’। এই মিশনের আওতায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৫৪ যুগল এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেইর আল-বালাহতে ৩০০ যুগলের বিয়ের আয়োজন করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এটি সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় বড় আয়োজন। তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, দ্য ন্যাশনাল, রোয়া নিউজ ও গালফ নিউজ।
Leave a Reply