জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে নিজের সরকারি বাসভবনে সদ্য কারামুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যতদিন পর্যন্ত জনগণের প্রতিটি অধিকার তাদের হাতে ফিরে না আসবে, ততদিন এই সংগ্রাম থামবে না।
কারামুক্ত মেজর আখতারুজ্জামানের সাহস ও সংগ্রামের ভূয়সী প্রশংসা করে ডা. শফিক বলেন, ‘আমাদের সহযোদ্ধা আখতারুজ্জামান দেশ ও প্রবাসীদের অধিকারের প্রশ্নে যেভাবে আপসহীন লড়াই করেছেন এবং কারাবরণ করেছেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার।
তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আমরা কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। আমাদের লক্ষ্য কেবল আল্লাহ তায়ালাকে ভয় পাওয়া। তিনি বর্তমান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিরোধীদের দমন করার জন্য অপপ্রচার ও মিথ্যা মামলার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নোংরা রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সরকারের নিজেদের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি সতর্ক করেন। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, ওই সাপই একদিন ছোবল দেবে। সাপ কিন্তু পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরা লাশ পড়ে থাকবে।’। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এখন ১৫-২০ মিনিটে লাগেজ পাওয়া যায়।’।
সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি ও লাগেজ চুরির মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণেই মেজর আখতারুজ্জামানকে মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়। যদিও ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবেই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়, যা থেকে দুর্নীতির বিষয়টি পরিষ্কার। তিনি আরও জানান, বিমানবন্দরে এখন বডি ক্যামেরা ও প্রযুক্তির যে ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, তা মূলত আখতারুজ্জামানের সাহসী প্রতিবাদেরই সুফল। এক মাস তিন দিনের মাথায় মেজর আখতারুজ্জামানের মুক্তিতে শুকরিয়া আদায় করে জামায়াত আমির বলেন, তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিয়ম-দুর্নীতি ও ভোগান্তির কথা বলার কারণে জেলে গিয়েছিলেন। তিনি কারো গায়ে হাত দেননি, কিন্তু তাঁর ওপর মিথ্যা মামলা চাপানো হলো যে, তিনি সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত দিয়েছেন—যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। ‘আমরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা শুনে তখনই প্রতিবাদ করেছি। তিনি বলেন, ‘সেদিনের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে দুজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ‘এরপরে ব্যাগ কাটা ও লাগেজ চুরি করা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তারপরে ভিত্তিহীন এই মামলায় নিম্ন আদালতে তাঁর চোখ বেঁধে উঠানো হলো, মাথায় হেলমেট পরানো হলো, বুকে সেফটি জ্যাকেট পরানো হলো—সবগুলোই লজ্জা। ঠিক তিনি ট্রলি নিয়ে কথা বলেছিলেন যে, এখানে এসে ট্রলিকে লটারির মতো টানতে হয়। কেউ পায়, কেউ পায় না; টানাটানি করে এক ট্রলি তিন প্যাসেঞ্জার—এটা হবে কেন। তাহলে এটাও মেনে নিয়েছে যে দুর্বলতা ছিল।’।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, ‘জেলে যাওয়া আমার জন্য বড় কথা নয়। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি এবং এর মাধ্যমে সরকারের ভেতরের নগ্ন আক্রোশ ও প্রতিশোধপরায়ণতার চিত্র সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। ডিবি পুলিশ আমার বাসায় এসে যখন দেখে খালেদা জিয়ার ছবি টাঙানো আছে, তখন তারা রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল।’ তিনি জানান, বড় বড় রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনেও তিনি আপসহীন ছিলেন এবং বর্তমানেও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথানত করতে রাজি নন। এই জনগণ আর ফ্যাসিবাদকে কখনো কবুল করে নেবে না, ফ্যাসিবাদের কাছে আর মাথা নত করবে না।
মেজর আখতারুজ্জামান মঙ্গলবার সকাল ১০টায় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, মোবারক হোসেন এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি সহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংসদের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে সরকারদলীয় নেতাদের সমালোচনা করেন ডা. শফিক। তিনি বলেন, ‘বসন্তের কোকিলদের মতো যারা এখন কুহু কুহু করছে, তাদের গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ তিনি সরকারকে আহ্বান জানান, বিরোধীদলের চরিত্রহননের চেষ্টা বাদ দিয়ে ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা দূর করতে মনোযোগী হতে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি কোনো মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না; বরং আইনানুযায়ী লড়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘দেশের পাহাড়সম ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা চাপা দেওয়ার জন্য এখন বিরোধীদলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা হয়েছে। আমরা সাবধান করে দিচ্ছি—বিরোধীদলের চরিত্রহনন বাদ দিয়ে আপনাদের ব্যর্থতার সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তা করেন, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়, মানুষ আপনাদের সমর্থন করবে। আর যদি মনে করেন যে, অতীতের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমিয়ে দেবেন, স্তব্ধ করে দেবেন, তাহলে আপনাদের দুঃসংবাদ দিচ্ছি—এটি বাংলাদেশে আর হবে না, ইনশাআল্লাহ। সংবদ্ধ জনবল রুখে দাঁড়িয়েছে, রুখে দাঁড়াবে এবং দিন দিন এর গতি বৃদ্ধি পাবে, একটা জায়গায় গিয়ে তার পূর্ণ সমাধান হবে, ইনশাআল্লাহ।’। আমি তাঁর মনোবল দেখে সত্যিই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললাম যে, আপনি শক্ত আছেন, শক্ত থাকেন; আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন, ইনশাআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ।’। যদি তাঁদের কোনো অপরাধই না থাকত, তাহলে দুজনকে বরখাস্ত করল কেন। এখন যেটুকু স্বস্তি ফিরে এসেছে, তা আল্লাহর মেহেরবানী এবং তাঁর প্রতিবাদের ফসল।’।
মেজর আখতারুজ্জামানের কারামুক্তিতে শুকরিয়া আদায় করে জামায়াত আমির দেশবাসী ও প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর পুরো জাতি ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেভাবে সংহতি প্রকাশ করেছেন, তা অসাধারণ। উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। দলের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার সময় উপস্থিত নেতারা জানান, এই আন্দোলন সত্য ও ন্যায়ের পথে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বেগবান হবে।
পরিশেষে, মেজর আখতারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি বলেই জামিন পাওয়ার আগ পর্যন্ত মাথা উঁচু করে লড়াই করে গেছেন। ডিবি হেফাজতে থাকাকালীন বিভিন্ন চাপের মধ্যেও তিনি অবিচল ছিলেন। অনুষ্ঠানে সমবেত জনতার উদ্দেশে দলের অন্যান্য নেতারাও বক্তব্য রাখেন এবং এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। হাইকোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তি পেয়েছেন, যা সত্যের জয় হিসেবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
Leave a Reply