রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন

পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা: সিম্পসন’স প্যারাডক্স কেন আমাদের বিভ্রান্ত করে

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৮ সময় দেখুন

অনলাইন ডেস্ক, ১০ অক্টোবর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): পরিসংখ্যান অনেক সময় আমাদের ভুল পথে চালিত করতে পারে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো সিম্পসন’স প্যারাডক্স। বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য দুটি হাসপাতালের উদাহরণ নেওয়া যাক। প্রাথমিক দৃষ্টিতে সার্বিক সফলতার হার দেখলে মনে হতে পারে হাসপাতাল ‘ক’ হাসপাতাল ‘খ’-এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, প্রতিটি আলাদা রোগীর শ্রেণিতে হাসপাতাল ‘খ’-এর সাফল্য তুলনামূলক বেশি। এই প্যারাডক্সের মূল কথা হলো, আলাদা আলাদা উপাদানের প্রবণতাগুলো যখন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সামগ্রিক ফলাফলটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিসংখ্যানের এই রহস্যময় আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকে তথ্যের গঠন বা ভেরিয়েবল। রোগীর ধরন অনুযায়ী সফলতার হারের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো

হাসপাতাল ‘ক’ ও ‘খ’-এর তুলনামূলক পরিসংখ্যান

  • সহজ কেসে সফলতার হার: হাসপাতাল ‘ক’ ৯৫%, হাসপাতাল ‘খ’ ৯৭%।
  • গুরুতর কেসে সফলতার হার: হাসপাতাল ‘ক’ ৬০%, হাসপাতাল ‘খ’ ৭০%।

এখানে দেখা যাচ্ছে, সহজ বা গুরুতর—উভয় ক্ষেত্রেই হাসপাতাল ‘খ’-এর কর্মদক্ষতা বেশি। অথচ সামগ্রিক রোগীর সংখ্যার বিন্যাসে পার্থক্য থাকায় গড় হিসাবে হাসপাতাল ‘ক’ এগিয়ে থাকে। ১০০০ রোগীর ভিত্তিতে এই বিভাজনটি নিম্নরূপ ধোঁকাটা লুকিয়ে আছে সংখ্যাগুলোর পেছনের গঠনে ধরো, হাসপাতাল A বেশির ভাগ সহজ রোগীর চিকিৎসা করে, আর হাসপাতাল B – এর কাছে আসে বেশি গুরুতর রোগী।

হাসপাতাল ‘ক’-এর সফলতার হিসাব

  • সহজ কেস: ৯০০ জন × ৯৫% = ৮৫৫ জন সফল।
  • গুরুতর কেস: ১০০ জন × ৬০% = ৬০ জন সফল।
  • মোট সফলতার হার: ১০০০ জনের মধ্যে ৯১৫ জন অর্থাৎ ৯১.৫%।

হাসপাতাল ‘খ’-এর সফলতার হিসাব

  • সহজ কেস: ১০০ জন × ৯৭% = ৯৭ জন সফল।
  • গুরুতর কেস: ৯০০ জন × ৭০% = ৬৩০ জন সফল।
  • মোট সফলতার হার: ১০০০ জনের মধ্যে ৭২৭ জন অর্থাৎ ৭২.৭%।

প্রতিটি ভাগে ‘খ’ ভালো করলেও, রোগীর সংখ্যার ভিন্ন অনুপাতের কারণে সামগ্রিক ফলে ‘ক’ জয়ী হয়। এর থেকে স্পষ্ট, কেন শুধু মোট হারের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো সেবার মান যাচাই করতে হলে সামগ্রিক গড়ের বদলে নির্দিষ্ট বা ক্ষুদ্রতর গ্রুপের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

এই ধরনের পরিসংখ্যানগত গোলকধাঁধা শুধু কাল্পনিক নয়, বাস্তবের উদাহরণও রয়েছে। ১৯৭৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির স্নাতকোত্তর ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণে এমনটি দেখা গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ভর্তি প্রক্রিয়ার গড় হিসাব দেখে মনে হচ্ছিল নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি সুযোগ পাচ্ছেন, যা প্রথম দর্শনে বৈষম্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু বিভাগভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক বিভাগে নারীদের ভর্তির হার পুরুষদের সমান বা তার চেয়ে বেশি ছিল। দুটিতেই একই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়। একটি পরিসংখ্যানগত ঘটনা, যেখানে আলাদা আলাদা গ্রুপে একটি প্রবণতা একদিকে দেখা যায়, কিন্তু সেই গ্রুপগুলোকে একসঙ্গে করলে প্রবণতাটি উল্টে যায়।

তাহলে সামগ্রিক হিসাবে কেন পার্থক্য তৈরি হলো? এর কারণ হলো, নারীরা সাধারণত এমন সব বিভাগে বেশি আবেদন করেছিলেন যেখানে প্রতিযোগিতার হার অনেক বেশি ছিল। বিপরীতে, পুরুষদের একটি বড় অংশ আবেদন করেছিলেন তুলনামূলক সহজ শর্তের বিভাগে। ফলে তথ্যের বিভাজন ভিন্ন হওয়ায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের গড় ফলাফলটি খণ্ডিত রূপ পায়। সিম্পসন’স প্যারাডক্স আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, পরিসংখ্যানের সরলীকরণ অনেক সময় প্রকৃত বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। তাই তথ্যের গভীরে না গিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর