সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে বিদ্যমান নগরপরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ডট কম আয়োজিত নবম অনলাইন আবাসন মেলা ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক আয়োজনে বক্তারা বলেন, ঢাকাকে আশপাশের ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি বেদখল হওয়া জলাশয়, খেলার মাঠ ও পার্ক উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি জমি রক্ষায় উঁচু ভবন নির্মাণের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আবাসনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা ও ভর্তুকির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরিবেশবান্ধব আবাসনকে জনপ্রিয় করতে লাগবে সরকারের প্রণোদনা। ডট কম আয়োজিত নবম অনলাইন আবাসন মেলা ২০২৬ উপলক্ষে ‘রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের পাঁচটি অধিবেশনে আবাসন খাতের ব্যবসায়ী, স্থপতি ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এ কথাগুলো বলেন।
সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে স্বাগত বক্তব্যে সম্পাদক মতিউর রহমান জানান, সহজে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনাবেচার সুযোগ তৈরি করতেই ৯ বছর আগে এই অনলাইন মেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এবারের মেলার স্লোগান ছিল ‘সময় এসেছে আবার, ঘরে বসেই স্বপ্নের আবাস খোঁজার’। মেলা শেষে আয়োজিত পাঁচটি অধিবেশনে আবাসন খাতের ব্যবসায়ী, স্থপতি ও নীতিনির্ধারকেরা খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সহজেই ঘরে বসে কিংবা বিদেশে থেকে যাতে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনা যায়, সেই চিন্তাভাবনা থেকেই ৯ বছর আগে আমরা অনলাইন আবাসন মেলা শুরু করেছিলাম। ‘সময় এসেছে আবার, ঘরে বসেই স্বপ্নের আবাস খোঁজার’ শীর্ষক স্লোগানে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১০ দিনের অনলাইন আবাসন মেলা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকতে চাই।
‘আবাসন খাতের পুনর্বিন্যাস: নীতি, অগ্রগতি ও সম্ভাবনা’ বিষয়ক সমাপনী অধিবেশনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় আসা অভিবাসীদের বড় অংশ দরিদ্র হওয়ায় তারা উপকণ্ঠে থাকছেন। সঠিক পরিকল্পনা ও কমপ্লায়েন্স না থাকলে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে আগ্রহী হবে না, তবে সাভার, গাজীপুর কিংবা মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত ঢাকাকে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি তানভীরুল হক প্রবাল এ সময় বলেন, অতিরিক্ত ব্যয় ও প্রণোদনার অভাবে পরিবেশবান্ধব ভবনগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি ঢাকার বাইরে আবাসন প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষি জমি বাঁচাতে ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন ট্রপিক্যাল হোমসের এমডি শেখ রবিউল হক। তিনি জানান, ৩০০ ফুট রাস্তা থেকে নরসিংদী এবং বুড়িগঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত বিস্তীর্ণ কৃষিজমি আবাসন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বর্তমানে অধিকাংশ ভবনই ৭-৮ তলা। ভবনগুলো ৪০-৫০ তলায় উন্নীত করা গেলে ভূমির ব্যবহার সাশ্রয়ী হতো। স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বিদ্যমান ভবনগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে আবাসন সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। অন্যদিকে এবিসি রিয়েল এস্টেটের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত ক্রেতাদের আস্থার সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা ও মান নিশ্চিতের তাগিদ দেন। অধিবেশনে এবিসি রিয়েল এস্টেটের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত বলেন, সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও ক্রেতার লগ্নি করা অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, আইনগত কাগজপত্রের স্বচ্ছতার অভাব, নির্মাণ ব্যয় কমাতে ভবনের মানের সঙ্গে আপস করার কারণে আবাসন কোম্পানি ক্রেতাদের আস্থা হারায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্রেতাদের বুঝতে হবে কোন কোম্পানি থেকে ফ্ল্যাট কিনবেন।
রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল আবাসন খাতের সংস্কার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ৩০ দিনে নকশা পাস হওয়ার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে তা দুই বছর পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। এ ছাড়া গৃহঋণের উচ্চ সুদহার (১৪-১৫ শতাংশ) এবং এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় সাধারণের জন্য আবাসন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি এই সুদহার কমানোর ওপর জোর দেন। ৩০ দিনে ভবনের নকশা পাস হওয়ার কথা থাকলেও ২ বছরেও তা হচ্ছে না।
‘ভবিষ্যতের আবাসন খাত’ অধিবেশনে র্যানকন রিয়েল এস্টেটের এমডি মাশিদ রহমান আগামী প্রজন্মের জন্য টেকসই আবাসনের প্রয়োজনে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং তাপ নিরোধক গ্লাসের ব্যবহারের কথা বলেন। রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটের সিইও সাব্বির হোসেন খান ‘গেটেড কমিউনিটি’র ধারণাকে ভবিষ্যতের আবাসন হিসেবে উল্লেখ করেন। আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা জানান, ইস্টার্ন ব্যাংকের মোহাম্মদ সালেকীন ইব্রাহিম পরিবেশবান্ধব গাড়ি কেনার ঋণের মতো আবাসন ঋণেও বিশেষ সুবিধার পক্ষে মত দেন। আইপিডিসির মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম উন্নত বিশ্বের মতো ৫ শতাংশ সুদহারে গৃহঋণ নিশ্চিত করতে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের পরামর্শ দেন।
ক্রেতাদের আস্থা ফেরানোর বিষয়ে আচিভ কনসালটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ ইকবাল বলেন, আবাসন খাতে সত্যবাদিতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের জীবনের বড় সঞ্চয় দিয়ে কেনা স্বপ্নের ছাদ ঘিরে যেন কোনো ধরনের আস্থার সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন থাকতে হবে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বিটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাহবুবুর রহমান এবং বিজনেস স্ট্র্যাটেজিক ও করপোরেট ট্রেইনার মার্ক অনুপম মল্লিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে খাতের রূপান্তর ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আলোচনা করেন।
Leave a Reply