সুন্দরবনের সুরক্ষা, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটে বাগেরহাটের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকার ধানসিঁড়ি মিলনায়তনে ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল সংলাপে এই দাবি তোলা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় একশনএইডের সুশীল প্রকল্প ও আয়োজনে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় এই জেলার জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মোংলা বন্দর, ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। মোংলা ইপিজেডে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।
বাগেরহাট জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর রহমান আলম সুপেয় পানির তীব্র সংকট নিরসনে মোল্লাহাটের মধুমতী নদী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, খুলনায় মধুমতী থেকে পানি নেওয়া হলেও বাগেরহাটের মানুষ বঞ্চিত। উপকূলীয় জেলা হিসেবে বাঁধের নাজুক অবস্থার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাঁধ দিয়ে কিছু জমি রক্ষা পেলেও পানির কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তাঁদের এখানে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এখানে নদীকেন্দ্রিক দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। লবণের প্রভাব কৃষি, চিংড়ি চাষসহ সব ক্ষেত্রে; কিন্তু এই অঞ্চলে এসব সংকট নিরসনে কখনোই বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে না। ‘রামপালে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একসময় আমরা আন্দোলন করেছি; কিন্তু তা উপেক্ষা করেও নির্মাণ করা হচ্ছে। না হলে তা আমাদের জন্য ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাগেরহাট জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি শেখ ইউনুস আলী উপকূলীয় চার উপজেলায় লবণাক্ততার ভয়াবহ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, কাঁচা মাটির বেড়িবাঁধ টেকসই হচ্ছে না। অনেক এলাকায় বাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে লোকালয় তলিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মোংলা ও মোরেলগঞ্জের যাতায়াতব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে তিনি দ্রুত সেতু নির্মাণের দাবি জানান। যাঁদের বেশির ভাগ নারী; কিন্তু তাঁদের যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ। যে গাছের নামে সুন্দরবন, লবণাক্ততার কারণে সেই গাছই হারিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাট শাখার সম্পাদক এস কে এ হাসিব।
বাগেরহাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, সুন্দরবনকে অগ্রাহ্য করে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প এই অঞ্চলের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শঙ্কার পর এখন এলএমজি টার্মিনালের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সুন্দরবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। এই অঞ্চলের যেকোনো ভাবনায় সবার আগে সুন্দরবনকে আগ্রাধিকার দিতে হবে।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে বাগেরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোহেল পারভেজ বলেন, লবণাক্ততার কারণে ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন মরণব্যাধি ও প্রতিবন্ধিতার হার এখানে তুলনামূলক বেশি। তাই গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটে এই বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় আনা জরুরি। বাগেরহাটে দেশের অন্য অনেক এলাকার চেয়ে ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদ্রোগ, থ্যালাসেমিয়া বা লিউকেমিয়ার রোগী বেশি।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাওলাদার মনিরুজ্জামান বলেন, বিসিক শিল্পনগরী আজ ধ্বংসের পথে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে মোংলা বন্দর ও ইপিজেডের আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া স্থানীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বাল্যবিবাহ রোধে বিশেষ উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুলের অধ্যক্ষ ফারহানা আক্তার। শিল্প ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলাও সেভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরে সিপিবি নেতা বেলাল হোসাইন বলেন, সুন্দরবন ও ঐতিহাসিক মসজিদ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের অভাবে জেলাটি পিছিয়ে পড়ছে। সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সুজনের সম্পাদক এস কে এ হাসিব, সংস্কৃতিকর্মী জ্যোৎস্না দেবনাথ এবং আইআরবির সমন্বয়কারী কাজী জাভেদ খালিদ। এছাড়া পানিসম্পদ উন্নয়ন বোর্ড, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সিএসও সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এক জেলায় দুটি বিশ্ব–ঐতিহ্য—একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক মসজিদ। যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে বেসরকারি সংস্থা আইআরবির সমন্বয়কারী কাজী জাভেদ খালিদ বলেন, সবকিছু সমান্তরালভাবে দেখলে হবে না।
Leave a Reply