ঢাকা, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যময় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শোক ও সন্দেহের ছায়া নেমে এসেছে। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে আর ফেরেননি এই তরুণ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদে তার মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। ৯৯৯-এ এমন খবরের ভিত্তিতে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো রঙের জামা। পকেটে থাকা আইফোন ও হাতের ঘড়ি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, তার ছেলের এই পরিণতি কোনোভাবেই আত্মহত্যা নয়। তাহসিফকে পরিকল্পিতভাবে প্রাণনাশের পর নদীতে ফেলে রাখা হয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। যদিও কে বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কে এম এনায়েতুল করিম এ অভিযোগ করেন। বরং তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
নিহত তাহসিফের বাবা জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামের এক বন্ধু তাকে নিতে বাসায় আসে। নিচে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার কথা বলে তাহসিফ বাসা থেকে বের হন। তিনি বলেন, আমার ছেলে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিল। বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে সে কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং সব ক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। তার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা বা কারো সঙ্গে বিরোধ থাকার কথা আমাদের জানা নেই। ঘটনার দিনও সে মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছে এবং বাবার জন্যও উপহার কিনেছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে আত্মহত্যার কোনো কারণই থাকে না। এ কারণে কী ঘটেছে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তাহসিফের পেশাগত জীবনের কথা তুলে ধরে তার বাবা জানান, তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।
সবশেষ তিনি ভার্গ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি বিশ্রামে ছিলেন। ছেলের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি সবসময় ওয়াকিবহাল ছিলেন জানিয়ে বলেন, রাতে ছেলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মা তাকে ফোনেও পাননি। পরে রাত ১টার দিকে তাহসিফ মাকে মেসেজ দিয়ে জানান যে তিনি বাসায় ফিরছেন, কিন্তু আর ফেরেননি।
বুধবার দুপুরের দিকে পুলিশের কাছে গিয়ে ছেলের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলেন এনায়েতুল করিম। তখন পুলিশ তার ছেলের সন্ধান দিতে পারেনি। পরে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ফোন করে তাকে তুরাগ নদে মরদেহ পাওয়ার খবরটি নিশ্চিত করা হয়। রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় ছেলের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হতবাক বাবা বলেন, ওই এলাকায় তাহসিফের যাওয়ার কোনো কারণ নেই। সেখানে কেন সে গেল, তা আমাদের কাছে বড় এক বিস্ময়। তারপরও সেখানে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা তারা বুঝতে পারছেন না। নৌ পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর দেওয়া হয়।
মরদেহ উদ্ধার ও আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রাথমিকভাবে তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে কোনো আঘাত বা জখমের দৃশ্যমান চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য তারা অপেক্ষা করছেন। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
হাসপাতাল মর্গ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে একজন স্বজন মরদেহের সঙ্গে এলেও পরে তিনি চলে যান। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর লাশবাহী গাড়ির চালক সামিউল জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মরদেহ উত্তরায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বর্তমানে পুরো বিষয়টি রহস্যের জট হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে। বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি উড্ডয়নেও তিনি ভালো ছিলেন। যে লাশবাহী গাড়ি করে সাবেক এই কর্মকর্তার মরদেহ আনা হয় সেই চালক সামিউল বলেন, আমাকে মালিক বলেছে এখানে মরদহ নিয়ে আসতে। এখন ভেতরের কাজ শেষে মরদেহ আবার গাড়িতে তোলা হয়েছে, আমি উত্তরায় নিয়ে যাব।
Leave a Reply