সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

করলেন: উত্তেজিত কংগ্রেস সভাপতি ‘মোদির বাপও যাবে’ বলে কেন

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৪ সময় দেখুন

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক জনসভায় মেজাজ হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি আগামী ৩০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভার ভোটের প্রচারে মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছিলেন, মোদি এক ‘বিষাক্ত সাপ’। মোদিকে না সরিয়ে আমি মারা যাচ্ছি না: কংগ্রেস সভাপতি।

বিহারের পাটনায় গত রোববার বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংয়ের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কংগ্রেস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটান। নীতিন নবীন বলেন, দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিয়ে কংগ্রেস ভাবে না।

খাড়গে অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগনের সাথে প্রতারণা করছেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছেন।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় কারচুপি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরলে এই কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের জেলে পাঠানো হবে।

এমনকি এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকেও জেলে পাঠানোর কথা বলেন।

খাড়গের এই বক্তব্যের সময় দর্শক সারি থেকে এক তরুণ ‘মোদি নেহি যায়েগা’ অর্থাৎ মোদি ক্ষমতাচ্যুত হবেন না বলে চিৎকার করেন। সাধারণত মৃদুভাষী হিসেবে পরিচিত খাড়গে এ সময় উত্তেজিত হয়ে ওই তরুণের উদ্দেশে বলেন, ‘মোদির বাপও যাবে।’ এ সময় কংগ্রেস কর্মীরা ওই তরুণকে সভা থেকে বের করে দেন এবং তাকে মারধর করা হয়। সন্তোষ কুমার নামের ওই তরুণ পরে গণমাধ্যমকে জানান, তাকে ভুল বোঝা হয়েছে, কারণ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন মোদিকে সরানো এত সহজ নয়, তার জন্য আন্দোলনের প্রয়োজন। তিনি নাকি বলেছিলেন, অত সহজে মোদি যাবেন না। নিজের ‘অনগ্রসর’ জাতের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, কংগ্রেস তাঁকে জাত তুলে অসম্মান করেছে। মোদিকে চিদাম্বরম ‘এনকাউন্টার মুখ্যমন্ত্রীও’ বলেছিলেন। রাহুল সেই কথার রেশ টেনে বলেছিলেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’।

এই মন্তব্যের পর দেশজুড়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, খাড়গে শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, একের পর এক নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে কংগ্রেস এখন হতাশা থেকে কুকথার রাজনীতি করছে এবং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে দলটি আরও অশালীন হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘বাপ’ তুলে কথা বলার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অমিত শাহ লিখেছেন, ‘একের পর এক ভোটে হেরে কংগ্রেস হতাশা ও নৈরাশ্যে ডুবে গেছে। কুকথার রাজনীতি ছাড়া তাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

এছাড়া বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্র, অনুরাগ ঠাকুর এবং নীতিন নবীনসহ অন্যান্যরা এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত বলে অভিহিত করেছেন। অনুরাগ ঠাকুর দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই কংগ্রেস নেতারা মোদিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে আসছেন, এবার তারা তার প্রয়াত বাবাকে টেনে এনে নতুন সীমা অতিক্রম করেছেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট সিং এবং লোকজনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসোয়ানও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং কংগ্রেসের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছেন। তারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।’। ২০১২ সালে কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে ‘রাবণের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, অহংকার ত্যাগ না করলে তাঁর দশাও রাবণের মতো হবে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেছিলেন, মোদি একজন ‘কম্পালসিভ লায়ার’ বা অভ্যাসগত মিথ্যুক। ২০১২ সালে কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের প্রয়াত স্ত্রী সুনন্দা পুষ্করকে ইঙ্গিত করে মোদি তাঁকে ‘৫০ কোটির গার্লফ্রেন্ড’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন।

বিজেপি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খাড়গের মন্তব্যের প্রতিবাদে সোমবার দেশের প্রতিটি রাজ্যে ও জেলায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বিজেপি ও আরএসএস পরিকল্পিতভাবে সভায় লোক ঢুকিয়ে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছে এবং বিরোধী নেতাদের মনোযোগ বিঘ্নিত করছে।

ভারতীয় রাজনীতিতে নেতাদের একে অপরের বিরুদ্ধে কটু মন্তব্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে বিভিন্ন সময় মোদিকে ‘গুজরাটের কসাই’, ‘মৃত্যুর সওদাগর’, ‘নিচু মনের মানুষ’, ‘রাবণ’ বা ‘বিষাক্ত সাপ’ বলে সম্বোধন করেছেন কংগ্রেস নেতারা। একইভাবে, মোদিও বিভিন্ন সময় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। ২০০৪ সালে সোনিয়া গান্ধীকে ‘জার্সি কাউ’ এবং রাহুলের ক্ষেত্রে ‘হাইব্রিড বাছুর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। ২০০৭ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের সময় কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী নেই বিশেষণই কিছুটা ঘুরিয়ে মোদিকে ‘মৌত কা সওদাগর’ বা ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলেছিলেন। ২০১৭ সালে মণিশংকর আয়ার মোদিকে ‘নিচ আদমি’ বা ‘নিচু মনের মানুষ’ বলেছিলেন। মোদিও বিভিন্ন জনসভায় বলতে শুরু করেন, দিনে তিনি ২ থেকে ৩ কেজি গালাগালি হজম করেন। ২০০৪ সালে লালকৃষ্ণ আদভানির ‘ভারত উদয় যাত্রা’ চলাকালে এক জনসভায় সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি বংশোদ্ভূত চরিত্র নিয়ে মোদি তাঁকে ‘জার্সি কাউ’ বা জার্সি গরু বলেছিলেন।

২০২৩ সালে বিজেপি নেতা অমিত মালভিয়া একটি তালিকায় দাবি করেছিলেন, কংগ্রেস নেতারা মোদিকে ৯১ বার গালিগালাজ করেছেন। এর জবাবে মোদি বিভিন্ন সভায় নিজেকে ‘গালি ডায়েটে’ থাকা নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেছেন, এই গালিই তার শক্তির উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে রাহুল গান্ধীকে ‘শাহি খানদানের যুবরাজ’, ‘শেহজাদা’ বা ‘ব্যর্থ পণ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মোদি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খাড়গের এই মন্তব্য আড়াই দশকের পুরনো সেই রেষারেষি ও অশালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গমগমে রাজনৈতিক আবহে খাড়গের এই মন্তব্য এক অন্য মাত্রা জুড়েছে। মোদি নিজেই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। ২০ বছর ধরে তিনি ‘গালি ডায়েটে’ রয়েছেন।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর