সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫ অপরাহ্ন

আয়ের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধি: চাপে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২০ সময় দেখুন

রাজধানীর কাজীপাড়ার বাসিন্দা ওয়াসিউর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। তাঁর অধীনে কাজ করেন অন্তত ২০ কর্মী। মাঠপর্যায়ে গ্রাহক পর্যায়ে বৈঠক, তদারকি এবং প্রতিষ্ঠানের কাজের মান বজায় রাখতে যাতায়াতসহ নানাবিধ খরচ তাঁকে ব্যক্তিগত পকেট থেকেই মেটাতে হয়। কিন্তু বছর শেষে যে বেতন পান, তা বাজারের বর্তমান মূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে মাস শেষে আর্থিক হিসাব মেলাতে গিয়ে তাঁকে নিয়মিত সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিদিন তাঁকে ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে হয়, নানা খাতের গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজের প্রয়োজনে পোশাকের মান বজায় রাখা, যাতায়াত করা এবং সর্বক্ষণ মুঠোফোন ও ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকার পেছনে প্রতি মাসে তাঁর পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। কিন্তু বছর শেষে যে পরিমাণ বেতন মেলে, তা বাজারদরের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। ওয়াসিউর রহমানের এই সংকট শুধু একা তাঁর নয়। বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল। তিনি জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টানা যাতায়াত এবং দুপুরে বাইরে খাওয়ার পেছনেই তাঁর বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়। ইনক্রিমেন্টের খাতা ইতিবাচক দেখালেও কেনাকাটার বাজারে গিয়ে কর্মী প্রতিদিন এই আয়ের ঘাটতি টের পাচ্ছেন। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো না থাকায় কোম্পানিভেদে বেতনের তফাত বিশাল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সংকটের ব্যাপ্তি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো পদে সীমাবদ্ধ নেই।

ওয়াসিউর রহমানের মতো দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম এবং চাকরির আনুষঙ্গিক খরচ সামলাতে গিয়ে অনেকের জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করা উত্তরা এলাকার একটি বায়িং হাউসের জুনিয়র কর্মী সোহেল রানা জানান, রোদে-বৃষ্টিতে ঘুরে কাজ করার বিপরীতে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত যাতায়াত ভাতা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে ব্যক্তিগত বেতন থেকেই খরচের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হয় তাঁকে।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতি থেকে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আয় যে গতিতে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে। সহজ কথায়, উপার্জনের তুলনায় নিত্যদিনের খরচের বাড়বাড়ন্তই সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে।

বিগত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেসরকারি খাতের এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই পাঁচ বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন কর্মীর সংসারের গড় খরচ প্রায় ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাঁচ বছর আগে ২০ হাজার টাকায় যে জীবনযাত্রা চলত, এখন তার জন্য প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা প্রয়োজন। অথচ বার্ষিক গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা হারে ইনক্রিমেন্ট পেলেও একজন কর্মীর প্রকৃত আয়ের ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। তিনি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হতে পারে) করে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। ফলে তাঁর বর্তমান মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা। সব হিসাব শেষে দেখা যাচ্ছে, বছরে দেড় হাজার টাকা করে নিয়ম মেনে ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পরও ওই কর্মীর প্রতি মাসে বাস্তব ঘাটতি থেকে যাচ্ছে অন্তত ২ হাজার ৯০০ টাকা। কানাডায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৃত্তি, পাবেন ৫০ জন।

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। মিরপুরের এক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পোশাক ও করপোরেট পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ থাকছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের পেছনে নীতিগত ব্যর্থতা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় অন্যান্য দেশ কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও বাংলাদেশে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো এবং ক্রমাগত বাজেটের আকার বড় করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থাকায় অতিরিক্ত শ্রমিকের জোগানের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ নামমাত্র বেতন বাড়াচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সুদের হার ও রেপো বাড়িয়ে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হবে।

পাশাপাশি সরকারের উচিত অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্প স্থগিত করা। মাহতাব উদ্দিনের মতে, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫-১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো জরুরি। এছাড়া বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলেই কেবল কর্মীরা তাদের দর-কষাকষির সক্ষমতা ফিরে পাবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর