রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ন

ভুল রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলে ফের ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৯ সময় দেখুন

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তেল নির্ভরতা কাটিয়ে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে রূপান্তরের যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পর্যটন ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে হুতিরা তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দিচ্ছে, যা প্রিন্স সালমানের স্বপ্নের বাস্তবায়নে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘ এক দশকের যৌথ জোটে ফাটল ধরেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) হঠাৎ প্রস্থান ও সেনা প্রত্যাহারে। গত বছরের শেষ দিকে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীর ওপর সৌদি বিমান হামলার ঘটনায় সম্পর্ক তিক্ত হয়, যার জেরে আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে সৌদি আরব একাই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়ে। সরে যাওয়ার সময় ইউএই-সমর্থিত যোদ্ধাদের চলে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে মারাত্মক শূন্যতা তৈরি করেছে, যা পূরণ করতে রিয়াদ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রণকৌশলের হঠাৎ পরিবর্তনে মাঠে থাকা হাজার হাজার যোদ্ধা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের এই অস্থিরতার সময়কাল সৌদি আরবের জন্য ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের মাত্র আট সপ্তাহ পর ইরান ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে যাওয়া হুতি প্রতিনিধিদের বিমানের অবতরণ ঠেকাতে সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি আরব। এর প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা যুদ্ধবিরতি ভেঙে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দখল করে নেয় এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় বিধ্বংসী আক্রমণ শুরু করে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি জানান, হুতিদের এমন সর্বাত্মক আক্রমণের জন্য সৌদি আরব প্রস্তুত ছিল না এবং মাঠের মিত্রদের সাথে সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অন্ধ নির্ভরতা সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল কৌশল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ট্রাম্পের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রত্যাশা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিতে ভাটা পড়েছে। গত মাসে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দুবার ট্রাম্পের সাথে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা সরাসরি নাকচ করে দেন। বরং যুক্তরাষ্ট্র ওমানে হুতিদের সাথে পৃথক বৈঠক করে লোহিত সাগরে নিজেদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ বেছে নিয়েছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি বলেন, সৌদি সামরিক বাহিনী কখনোই একা বড় যুদ্ধের জন্য গড়ে ওঠেনি, অথচ এখনকার পরিস্থিতি ট্রাম্পের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে সংকট উত্তরণে সৌদি আরব মিসর ও আমিরাতের সাথে আলোচনার পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্রিটেন যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সহায়তা এবং মার্কিন উপদেষ্টারা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসন এখনো অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি, ঐক্যবদ্ধ কমান্ড প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া ইয়েমেনের এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৌদি আরবের বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর