আব্দুল্লাহীল কাফী মাসুম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি-রংপুর, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): রংপুরের পীরগঞ্জের নিভৃত পল্লী খালাশপীর হাটের পশ্চিমে গোপীনাথপুর গ্রাম। এই গ্রামেই গত তিন দশক ধরে নিরবে ঘটে চলেছে ধর্মীয় শিক্ষার বিপ্লব। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া গোপীনাথপুর দারুস সুন্নাহ্ মজিদিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানাটি। তার মূলে রয়েছে একজন মানুষের আজন্ম সাধনা- তিনি হলেন হাফেজ রফিকুল ইসলাম ফারাজি।
১৯৯২ সালে এক তরুণ হাফেজ যখন এই প্রতিষ্ঠানের মোহতামিমের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তখন এটি ছিল জীর্ণশীর্ণ এক পাঠশালা মাত্র। কিন্তু রফিকুল ইসলাম ফারাজির চোখে ছিল এক বিশাল স্বপ্ন। তিনি এই মাদরাসাকে কোনো ইটের দালান মনে করেননি, বরং নিজের সন্তানের মতো মমতায় লালনপালন করেছেন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথচলায় অসংখ্য বাধা ও প্রতিকূলতা এসেছে, কিন্তু ত্যাগের কণ্টকাকীর্ণ পথে তিনি পিছপা হননি। মাদরাসায় তিনি একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। আর শিক্ষার্থীদের জন্য মনোরম পরিবেশে লেখাপড়া ও খেলার মাঠ করেছেন।
”একটি প্রতিষ্ঠান গড়া মানে কেবল দেয়াল তোলা নয়, বরং একটি আদর্শ প্রজন্ম তৈরি করা”-এই দর্শণকে বুকে ধারণ করেই তিনি আজ মাদরাসাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
রফিকুল ইসলামের অক্লান্ত পরিশ্রম আর এলাকাবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় আজ এই প্রতিষ্ঠানে বইছে শিক্ষার সুবাতাস। বর্তমানে মাদরাসাটির চিত্র ঈর্ষণীয়। বালক শাখায় বর্তমানে ২৫০ জন ছাত্র হাফেজিয়া ও মাওলানা বিভাগসহ বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর সময়ের প্রয়োজনে যুক্ত হয়েছে মহিলা শাখা। যেখানে ১২০ জন ছাত্রী দ্বীনি শিক্ষায় আলোকিত হচ্ছে। তাদেরকে শিক্ষা দিতে বালক শাখায় ১৬ জন এবং মহিলা শাখায় ৪ জন দক্ষ শিক্ষক নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করছেন। তাদেরকে প্রতিমাসে প্রায় দুই লক্ষ টাকা বেতন দিতে হয়।
দীর্ঘ ৩৪ বছরের এই সফরে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো স্বচ্ছতা। হাজারো মানুষের আমানত ও প্রতিষ্ঠানের সম্মানে তিনি এক বিন্দু কালিমা লাগতে দেননি।
হাফেজ রফিকুল ইসলাম ফারাজির এই ত্যাগ তিতিক্ষার গল্প কেবল একটি মাদরাসার ইতিহাস নয়। বরং সমাজ পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি পীরগঞ্জের মাটিতে ধর্মীয় জ্ঞানের এক চিরস্থায়ী প্রদীপ হয়ে জ্বলছে।
হাফেজ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় পৌনে ৪’শ শিক্ষার্থী সহ শিক্ষক-কমচারীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১২’শ প্লেট খাবার রান্না করা হয়। প্রায় ১০০ কেজি চাল সহ অন্যান্য খরচ মিলে প্রতিমাসে প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা খরচ হয়। বিপুল পরিমান খরচ যোগাড় করা খুবই কষ্টকর। সরকারিভাবে দু:স্থ, অসহায় ও এতিমদের জন্য পাওয়া বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের সহায়তা করছে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে দাতাদের সহায়তায় মাদরাসাটিতে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার মৃত্যুর পর মসজিদ, মাদরাসাটি যেন আমার পরকালীন জীবনের নাজাতের উছিলা হয়, এই দোয়া মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে করি।”
Leave a Reply