মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন

ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন : নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ হবে আজ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৩ সময় দেখুন

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): ইসরায়েলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের অগ্নিপরীক্ষা আজ। অথচ এটাকেই সংকট নিরসনে কয়েক দশক ধরে চলা শান্তি আলোচনার মূল ভিত্তি ধরা হয়।

দেশটির পার্লামেন্ট বা নেসেটের নির্বাচনে ভোটাররা তাদের রায় দেবেন।

এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে নেতানিয়াহুর ক্ষমতার ভবিষ্যৎ। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একদিকে ইরান ও গাজায় চলমান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান অটুট রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে ক্ষমতার বিদায় ঘণ্টার আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি। সেটা তখনই সম্ভব হবে, যদি তিনি (নেতানিয়াহু) ক্ষমতায় থাকেন। নেতানিয়াহু আর আইজেনকট—কারও জন্যই ক্ষমতার পথ সুগম নয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। গাজা ও ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর আজ ইসরায়েলে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে এসব সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর পর থেকে দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধেও ইসরায়েলকে যুদ্ধে জড়িয়েছেন তিনি।

এই দুই যুদ্ধ একদিকে তাঁকে বিশ্বমঞ্চে সমালোচিত করেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটা একঘরে করে ফেলেছে। এ দুটি যুদ্ধ দেশে–বিদেশে নেতানিয়াহুকে যেমন চরম সমালোচিত করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলকে কার্যত একা করে দিয়েছে।

আজ স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, যা চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো জোটকে অন্তত ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। ইসরায়েলের নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ভোট না দিয়ে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। এরপর দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়। পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য যেকোনো দলকে কমপক্ষে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এসব কারণে বিশ্লেষকদের অনেকে ইসরায়েলের বহুধাবিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার জন্য নেতানিয়াহুকে এগিয়ে রাখেন। কিন্তু এবারের হিসাব–নিকাশ এতটাও সোজা হবে না। নেসেটের ১২০ আসনে ভোট হচ্ছে। তত দিন নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালাতে হবে। এর ফলে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমত, যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর নেতৃত্ব এবং দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ট্রাম্প ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছেন। তবে বিরোধী জোটের দাবি ভিন্ন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে গঠিত বিরোধী শিবিরে রয়েছে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস। তাদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ভীতি ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছেন। আইজেনকোট মনে করেন, ইসরায়েলের জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে, ট্রাম্প তার সঙ্গেই পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। দুই দশক ইসরায়েল শাসনের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৪৮ সালে। তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ। ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরেরই তাঁর প্রতি সমর্থন রয়েছে।

নেতানিয়াহু এবারও লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোটের ওপর ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর এই জোটে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে এই দুই নেতার ওপর পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদ নিজেদের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছেন। জরিপ অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে বড় ব্যবধানে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদি কোনো জোট সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে আগামী বছর আবারও নির্বাচনের প্রয়োজন হতে পারে। ততদিন নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলো বলছে, কঠিন চাপে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক কট্টর ডানপন্থী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। দুজনের ওপরই পশ্চিমা কিছু দেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ইসরায়েলি সমাজে বর্তমানে গভীর বিভাজন চলছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় নিয়ে নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করছেন অনেকে। বিরোধী সমর্থক মালি হাজাজ জানিয়েছেন, ক্ষত নিরাময়ে একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা এখন জরুরি। আবার লিসা টরটরের মতো অনেকে মনে করেন, নেতানিয়াহুর আমলের ক্ষতি মেরামত করতে নতুন সরকার প্রয়োজন। তবে লিকুদ সমর্থক নফ গাবে মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুই সঠিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, নেতানিয়াহু বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি রয়েছেন, যা অনেকের সমর্থন হারানোর একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকে ৭ অক্টোবরের ওই হামলার দিনে ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায়ভার নির্ধারণ করার বিষয়টি সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করতে নারাজ লিকুদ পার্টির সমর্থক ১৮ বছর বয়সী নফ গাবে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলি রাজনীতির মূল স্রোত এখনো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ঘোর বিরোধী। গাদি আইজেনকোটও এই ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তবে তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোতজ এসা-এল সতর্ক করে বলেছেন যে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, নতুন সরকার খুব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের ভোট জোট রাজনীতির হিসাব উল্টে দিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদিও আইজেনকোট আনুষ্ঠানিকভাবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপথ্যে বড় ধরনের সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর