হেলথ ডেস্ক, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): হামের টিকা দেওয়ার পরও প্রায় ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে আশানুরূপ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি বলে একটি নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা বলছেন, টিকার কার্যকারিতা এবং বর্তমান টিকাদান ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। গবেষকেরা বলছেন, এক ডোজ টিকায় যত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে, দুই বা তিন ডোজ টিকায় তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা গড়ে ওঠে। ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৫০টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। আবার ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। টিকা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) যত টিকা ব্যবহৃত হয়, তার সবই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুর শরীরে হামের টিকা বেশি কার্যকর। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব শিশুর বয়স বাড়ছে, তারা টিকার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
জাতীয় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হওয়ার পর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আইইডিসিআরের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে ছয়টি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। গবেষণা দলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক ও ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণার জন্য ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জের ছয়টি উপশহর ও গ্রাম এলাকার ৩০৯টি শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের বয়স ৯ থেকে ৫৯ মাসের মধ্যে ছিল।
টিকার কার্ড যাচাই ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়ার পর শিশুদের রক্তের নমুনা নিয়ে আইইডিসিআরের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, ৩০৯ শিশুর মধ্যে কেবল ২০৩ জনের শরীরে (৬৫.৭ শতাংশ) হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ২১টি শিশুর (৬.৮ শতাংশ) ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি ছিল সীমান্ত পর্যায়ে, আর ৮৫ জনের শরীরে কোনো অ্যান্টিবডিই পাওয়া যায়নি। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন চালানো হয়। কিন্তু ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পার হলেও সংক্রমণ থামেনি। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি বছর সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০৪ জন। উল্লেখ্য, মৃত শিশুদের মধ্যে ৯২ শতাংশই টিকার আওতায় ছিল না। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা টিকার কার্যকারিতা হ্রাসের পেছনে একাধিক সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি জানান, টিকা পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় তাপমাত্রার হেরফের হলে এর গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। এছাড়া শিশুর অপুষ্টির মাত্রাও টিকার কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। তিনি বিষয়টির গভীর অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
টিকা কর্মসূচির কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে গত ১৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়। ৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য জানান, টিকা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার সুযোগ নেই কারণ এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
তিনি আইইডিসিআরের বর্তমান গবেষণার নমুনা ছোট উল্লেখ করে এটি থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানতে ৩ হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে আরও বড় একটি গবেষণা চলছে, যার ফলাফল নভেম্বর মাসের শেষ নাগাদ পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি।
সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে নেওয়া জরুরি। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুধু পাঁচ বছর নয়, বরং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ধাপে ধাপে টিকার আওতায় আনতে হবে। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত না করলে হামের মতো রোগের জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
Leave a Reply