বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

রংপুরে ৪ খুন তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো ডিবিকে, ডোমের বক্তব্যে ধর্ষণের অভিযোগ : পুলিশের বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সংগঠণের প্রতিবাদ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৭ সময় দেখুন

আব্দুল্লাহীল কাফী মাসুম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি-রংপুর, ২৬ আগষ্ট ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের ৪ সদস্যকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার জন্যই তদন্ত সংস্থা বদল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন কুমার চ্যাটার্জী গতকাল সোমবার বিকেলে ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিনাত আলীর কাছে মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য, আলামত ও নথিপত্র হস্তান্তর করেন। পরে সন্ধ্যায় সাবেক ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল নগরীর দাসপাড়া এলাকায় নিহত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় মিলন কুমার চ্যাটার্জী ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয় এবং প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য জিনাত আলীকে জানান। মিলন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলার তদন্তভার বদল করা হয়েছে। আমি নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার সব নথিপত্র হস্তান্তর করেছি। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া সব তথ্যও তাঁকে জানিয়েছি। আমরা পুরো বাড়িটি পরিদর্শন করেছি।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী এখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

এদিকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল রাতে রংপুর নগরীতে মশাল মিছিল করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এর আগে বিকেলে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি নগরীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে বিদ্যুতের লাইন কে কেটেছিল, তার ব্যাখ্যা দাবি করেন। একই সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীর হত্যার বিচার এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, চার খুনের ঘটনায় পুলিশের বয়ান আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে আমরা মনে করি। ঘটনার সব দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।

গত শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর দাসপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর আয়ুস (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলেছে, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জনই দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী অভিযুক্তদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় তাকে, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে।

‎ঘটনার পর ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়, নিহত দুই নারীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে, রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ডোমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। ডোমের দাবি, তাঁর মায়ের শরীরেও ধর্ষণের আলামত ও বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলে, তিনি ভ্যাজাইনা ও বীর্যের নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

পুলিশের বক্তব্য ও ডোমের দেওয়া তথ্যের এমন ভিন্নতায় ঘটনাটির নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাহলে কি সত্যিই এই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর নেপথ্যে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের বাইরে ভিন্ন কোনো ঘটনা রয়েছে।

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, বাড়িতে ঢুকে একই পরিবারের চারজনকে মাত্র দুজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব নয়। তার ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় কোনো শক্তি থাকতে পারে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে নগরীর মাছুয়া পাড়ার ওই বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের শুরুর আগে প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘সন্দেহটা ওই জায়গায় যে দুইটা ছেলের পক্ষে এই হত্যাকাণ্ড করা সম্ভব নয়। দুইটা ছেলে চারটে খুন করে তারা সুস্থভাবে ঘুমাবে, বাড়িতে বসে থাকবে। এটা কখনোই সম্ভব নয়।’’
হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত উল্লেখ করে গোপীনাথ বলেন, ‘’একটা মানুষ খুন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর পিছনে কোনো বড় শক্তি আছে অলক্ষ্যে, আড়ালে আমরা সঠিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’’

এদিকে গা হিম করা তথ্য ফাঁস করেছে মর্গের ডোম ! চার খুনের ঘটনায় মর্গের ওই ডোমের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর দাবি, নিহত আগামী চক্রবর্তী ও তাঁর মায়ের শরীরে ধর্ষণের আলামত এবং বীর্যের মতো নমুনা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। তবে ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, সন্দেহের কারণে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও রিপোর্টে কোনো স্পার্ম পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, ডোমের দাবি ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলে রয়েছে বড় পার্থক্য। তাহলে আসল সত্য কী? রংপুরের চার খুনের রহস্য উদঘাটনে সঠিক তদন্তই এখন সবার ভরসা।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর