বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন

বিএনপি সরকার প্রথম ৬ মাসে ফ্যাসিস্টের দেখনো পথ ধরেই হাঁটছে এবং মোটা দাগে ব্যর্থ হয়েছে : জামায়াত

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪২ সময় দেখুন

ঢাকা, ১৮ আগষ্ট ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় ‍রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মুল্যায়ন নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি সরকার প্রথম ৬ মাসে ফ্যাসিস্টের দেখনো পথ ধরেই হাঁটছে এবং মোটা দাগে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, যেসব সৎ চাকরিজীবীদের সরকারের নিজেদের লোক মনে হচ্ছে না তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি, ওএসডি করা হচ্ছে।

অর্থনীতির রিজার্ভ বৃদ্ধি ও গ্যাস বিদ্যুতের সংকট নিরসনে বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহন করে কমিটির গঠন করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, রির্জাভ বৃদ্ধির পেছনে সরকারের কোনো হাত নেই৷ প্রবাসীরা তাদের ঘাম ঝরানো টাকা দেশে পাঠানোর জন্যই বৃদ্ধি পেয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বলেন, ‘আমরা জানি, পুরো মেয়াদ শেষ না হলে মূল্যায়ন পুরোপুরি করা যায় না। কিন্তু ছয় মাস কম সময় নয়। এই ছয় মাসের মূল্যায়নে আমরা বলতে পারি, সরকার মোটাদাগে ব্যর্থ। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের পথেই হাঁটছে।’

মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে জনসভাগুলোতে বিএনপি বিদ্যমান কাঠামো সংস্কার এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের রায় কার্যকর ও বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার তা বাস্তবায়ন তো করেইনি, বরং এ বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির অবস্থানও পুরো জাতিকে বিস্মিত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ বিএনপি শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে, সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল দুই জায়গাতেই শপথ নিয়েছে। বিএনপি বলেছে, সংস্কার পরিষদের বিষয়টি সংবিধানে নেই। গণভোট যদি অবৈধ হয়, তাহলে গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের শপথ কীভাবে বৈধ হয়? এক মায়ের জমজ সন্তান—একটাকে স্বীকার করবেন, আরেকটাকে স্বীকার করবেন না, এমন অবস্থা হতে পারে না। গণভোটের গণরায় না মানা বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। জাতির কাছে দেওয়া ওয়াদা তারা রক্ষা করতে পারেনি। এটি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ।’

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মহেশখালী ও পটুয়াখালীর পায়রায় টার্মিনাল করার কথা থাকলেও সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণ পরিষ্কারভাবে জানে না। খুলনার খালিশপুরে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। দেশে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় জামায়াত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও সরকার তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের বসানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগেও দলীয় বিবেচনার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, আমরা ক্ষমতায় আছি, আমাদের লোকই তো থাকবে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই তো আপনারা হাঁটলেন। যারা ১১ দলকে বেশি গালাগালি করতে পারছে, তাদেরই প্রমোশন হচ্ছে।’ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম ১১০ দিনেই ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পাশাপাশি ডাকাতি, অপহরণ, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে।

ক্যাম্পাসগুলোতে সংঘাত ও হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারা আশা করেছিলেন জুলাই-পরবর্তী সময়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রক্ত ঝরবে না। কিন্তু আলিয়া মাদরাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই ছাত্রদল ও বিএনপিকে সহযোগিতা করছে।

পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পারওয়ার। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফিরিয়ে আনা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। সরকারের সময়ে সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের ঘটনাও ঘটেছে। এসব বিষয়ে সরকার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করেনি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য। জনগণের দোরগোড়ায় বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ছে, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইসলামী ব্যাংকসহ ব্যাংকিং খাতে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং গুম কমিশনের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিয়া গোলাম পারওয়ার। তার মতে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

কৃষিখাতের পরিস্থিতিকেও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। কৃষকরা উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষি উপকরণ ও সারের দাম বেড়েছে। কোথাও কোথাও খুচরা পর্যায়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনতে হচ্ছে। সার সংকট তৈরি হলে দেশে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পারওয়ার। তিনি বলেন, দলীয় লোকজন ও সিন্ডিকেট এসব সুবিধা লুটপাট করে নিচ্ছে। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য লোক নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন জায়গায় বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা দরিদ্র মানুষের জন্য নতুন বিড়ম্বনা সৃষ্টি করছে।

শিক্ষাখাতেও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ সরাসরি সংবিধানবিরোধী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও নবম পে-স্কেল নিয়েও সরকারের দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতেও নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পারওয়ার। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের অসংগতি রয়েছে। কোথাও একেক ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যাপক ঘাটতিও রয়েছে। হামসহ বিভিন্ন রোগে মানুষের মৃত্যুর জন্য আগের সরকারকে দায়ী করে বর্তমান সরকার নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী আসনের একজন অনির্বাচিত সদস্যকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিলের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কর্মকর্তারা এখনো সরকারের প্রশ্রয় পাচ্ছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ, ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পারওয়ার।

তবে সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছে জামায়াত বলে জানান তিনি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা ভালো অবস্থায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর কৃতিত্ব সরকারের নয়, প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার যে কমিটি করেছে, সেটিকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ উদ্যোগ গ্রহণে বিরোধী দলের দেওয়া প্রস্তাবের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

গোলাম পারওয়ার বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করব, সরকার যেন এসব সমস্যার সমাধান করে। সরকার ব্যর্থ হোক, আমরা চাই না। সরকারকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত। তবে মন্দ কাজের বিরোধিতা আমরা করব। আমাদের রাজনৈতিক ভূমিকা সংসদেও চলবে, বাইরেও চলবে।’

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াত নিয়মিত নিজেদের কর্মকাণ্ডও মূল্যায়ন করছে। সংসদে এবং সংসদের বাইরে তারা বিভিন্ন প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়ে আসছে এবং গঠনমূলক সমালোচনা করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের হরতাল, ভাঙচুর বা এসব কর্মসূচি করছি না। আমরা সংসদে ও বাইরে আমাদের প্রস্তাবনা রেখে আসছি, পরামর্শ দিচ্ছি এবং গঠনমূলক সমালোচনা করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড.এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, রফিকুল ইসলাম খাম এমপি, মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম, প্রচার মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর