বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটদের ট্রাম্পকে ঠেকার চ্যালেঞ্জ

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ সময় দেখুন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে রয়েছে। তবে আগামী জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসছে না। দায়িত্ব গ্রহণের পরও রিপাবলিকানদের কঠোর অবস্থানের কারণে ডেমোক্র্যাটদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হবে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি।

ভেটো দেওয়ার হুমকি ও আইনি জটিলতা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’ এ ছাড়া সিনেটে যেকোনো সাধারণ বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হয়। রিপাবলিকানদের প্রয়োজনীয় সমর্থন ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের নীতি পাস করানো ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন হবে। তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, মার্কিন জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে—এমন কোনো বিলে স্বাক্ষর না করার সাহস তিনি দেখাতে পারেন কি না, তা দেখার বিষয়। তাদের মতে, সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং নিজেদের ক্ষমতা সীমিত মনে করে থেমে যাওয়া। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। সিনেটে বিভিন্ন পদে নিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাবে তারা। এতে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি ‘একটুও’ উদ্বিগ্ন নন। কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু করা কোনো সামরিক সংঘাত ৬০ দিনের বেশি চালানোর ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও বাজার নিয়ন্ত্রণ

নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়। উদারপন্থি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ পণ্যের দাম প্রসঙ্গে বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে কমে।’ জ্বালানি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এমনকি শুল্ক প্রত্যাহার করা গেলেও বাজারে পণ্যের দাম কমতে সময় লাগতে পারে।

অ্যালেক্স জ্যাকেজ আলজাজিরাকে বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রধান নির্বাহীদের তলব করে কংগ্রেসে হাজির করানোর মাধ্যমে বাস্তব কিছু ফল পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে।’ তদন্তের ফলে হঠাৎ দরপতন না হলেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যসেবা ও সাশ্রয়ী সরকারি নীতি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বাকের স্বাস্থ্যসেবার সংকট তুলে ধরেন। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় দেওয়া বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে ডিন বাকের বলেন, এ ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। বাকের বলেন, ‘ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে থাকা রিপাবলিকানরা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার পক্ষে থাকতে চাইবেন বলে মনে হয় না।’ বাকেরের মতে, সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিলে সাশ্রয়ী প্রস্তাব যুক্ত করে রিপাবলিকানদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চাপ তৈরি করা সম্ভব। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ওই ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে ত্রিতা পারসির মতে, এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য টেকসই হবে না।

অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও শুল্কনীতির ওপর নজরদারি

ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ হিসেবে ট্রাম্পের নেওয়া শুল্কনীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এই যুদ্ধ বন্ধের জোর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। পারসি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না।

ট্রাম্প পরিবারের সম্পদ ও হোয়াইট হাউস তদন্ত

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের কঠোর তদন্তের পূর্বাভাস দিয়েছেন। আলজাজিরাকে পাঠানো একটি ই-মেইলে তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের শিরোনামের বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’ আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে ট্রাম্প আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন—এমন প্রবণতা তার মধ্যে দেখা গেছে।’।

হোয়াইট হাউসের আগাম অনুমতি ছাড়াই কংগ্রেস নিজস্ব ক্ষমতায় বিস্তৃত তদন্ত পরিচালনা করতে সক্ষম। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের যাত্রা শুরু হলে ট্রাম্প পরিবারের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে তদন্তের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাণিজ্যিক খাতে ট্রাম্প পরিবারের তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে।

তদন্তের সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণে অনুদান দেওয়া ব্যক্তিরা পরবর্তীতে সরকারের কাছ থেকে অনুপযুক্ত সুবিধা পেয়েছেন কি না। ডেমোক্র্যাট সিনেটররা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে তদন্তে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আইনি লড়াই, অভিশংসন ও আইসিই বাজেট

তদন্তের মুখোমুখি হওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সরাসরি সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। লরা ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা সমন পেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাক্ষ্য দিতে হাজির হবেন—এমনটা আশা করা কঠিন। বিচার বিভাগে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকায় তদন্তে কোনো বড় অনিয়ম প্রমাণিত হলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে।

তবে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা প্রয়োজনে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভিশংসনের প্রস্তাব তুলতে পারেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিরুদ্ধেও অভিশংসন উদ্যোগের বিষয়ে ইঙ্গিত মিলেছে। ট্রাম্প অবশ্য এই অভিশংসনের হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা অহেতুক এমনটা করলে রাজনৈতিকভাবে তাদের দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে পিট হেগসেথ খুব ভালো কাজ করছেন বলে ট্রাম্প তাঁর সমর্থন বজায় রেখেছেন। প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসন বিল পাস করলেও চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সিনেটে দীর্ঘ বিচারের প্রয়োজন পড়বে। নিজের প্রথম মেয়াদে দুবার অভিশংসিত হওয়া ট্রাম্প অবশ্য তৃতীয়বার অভিশংসিত হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

অন্যদের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যান অভিবাসন বাজেটের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি প্রকাশ করেন যে, গত দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসনকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অল্টম্যান জানান, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাওয়ায় অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) প্রায় কোনো কার্যকর বাধা ছাড়াই সারাদেশে কাজ করতে পারছে। তিনি উল্লেখ করেন, আটককেন্দ্রগুলোর অবমানবীয় পরিবেশ, অভ্যন্তরীণ নির্যাতনের অভিযোগ এবং করদাতাদের অর্থ অপব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। অল্টম্যান বলেন, ‘অভিযানের গতি কমানো এবং প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে আগের অধিবেশনে দেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।’ এখন প্রশ্ন, নির্বাচনি প্রচারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো হয়নি। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আ অর্থের প্রয়োজন হলে সেটি সামান্য কোনো অঙ্ক হবে না, যা সহজেই অন্য খাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।’।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর