চট্টগ্রামের ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলীর শ্রীশ্রী সেবা খোলা ও বৈকুণ্ঠধাম মন্দিরে এবার শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ সাজানো হয়েছে ‘রিপু রজনী’ নামক এক গভীর জীবনদর্শনের আদলে। মণ্ডপে পা রাখলে দেবীদর্শনের পাশাপাশি মানুষের মনোজগতের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য—এই ষড়রিপু কীভাবে মানুষের অদৃশ্য শত্রু হিসেবে ভেতরে কাজ করে, তা-ই এখানে শৈল্পিক আলোক ও অন্ধকারের বিন্যাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের যে নিরন্তর লড়াই, তারই প্রতিফলন যেন এই মণ্ডপসজ্জা। এ এক অন্তর্জগতের দরজা, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুরা লুকিয়ে থাকে নিজেরই ভেতরে। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনদর্শন।
দেবী দুর্গা কেবল বাইরের অসুর বিনাশকারীই নন, বরং তিনি মানুষের মনের ভেতরের অশুভ শক্তি দূর করারও প্রতীক। এই আয়োজনে দর্শনার্থীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বাইরের শত্রুকে পরাস্ত করার আগে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে চেনা ও তাকে জয় করা জরুরি। প্রতিহিংসা ত্যাগ করে ক্ষমা, লোভের পরিবর্তে সংযম, অহংকারের জায়গায় বিনয় এবং মোহের বদলে সত্যকে গ্রহণ করার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে প্রকৃত মুক্তি। এভাবেই পূজা কেবল আরাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আত্মোপলব্ধির একটি পথ হয়ে উঠেছে।
এই নান্দনিক আয়োজনের নেপথ্যে কাজ করেছে দক্ষ একদল সৃজনশীল কর্মী। পুরো পরিকল্পনা ও মণ্ডপ সজ্জার দায়িত্বে ছিল অপটিমিস্টিক। প্রতিমা নির্মাণে ছিলেন শিল্পী কার্তিক পাল এবং অলংকরণ ও আলোকসজ্জার কাজে দক্ষ হাত ছিল নিলয় নন্দীর। মণ্ডপের সার্বিক আলোকবিন্যাস করেছে কৈলাস লাইটিং। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মণ্ডপটি হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য ভাবনার কেন্দ্র।
পূজা মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হয়, দেবীদর্শন মানেই নিজের ভেতরটাকে নতুন করে দেখা। অন্ধকার যত গভীর হোক না কেন, তাকে জয় করার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের দুর্বলতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া। ‘রিপু রজনী’ যেন সেই অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জয়ী হওয়ার সাহসের নাম। উৎসবের আবহে এমন আধ্যাত্মিক আবহ সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে, যা দুর্গাপূজার মূল সুরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। আলোঝলমল মণ্ডপের ভেতর পা রাখতেই মনে হলো, এ যেন দেবীদর্শনের চেয়েও বেশি কিছু।
Leave a Reply