রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

লালনের আখড়াবাড়িতে সাধু-ভক্তদের মিলনমেলা, শুরু তিন দিনের আয়োজন

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৫ সময় দেখুন

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে তিন দিনের বিশেষ আয়োজন। শনিবার বিকেল থেকে এই উৎসব ঘিরে ছেঁউড়িয়া পরিণত হয়েছে সাধু-ফকির ও ভক্তদের মিলনমেলায়। আখড়াবাড়িতে আসা সাধুরা নিজেদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গুরুকার্য পালন করছেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাখালসেবা, অধিবাস ও বাল্যসেবা, যা রোববার দুপুরের পুনঃ সেবার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। সময় বদলেছে, আয়োজনের পরিসর বেড়েছে, কিন্তু আখড়াবাড়িতে আসার আকর্ষণ তাঁর কাছে ফুরায়নি। কেউ উচ্চ স্বরে বলছেন, ‘জয় লালন, জয় লালন’।

আখড়াবাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা হাতে ঘুরছিলেন ৭১ বছর বয়সী আবু বক্কর। ভেড়ামারার ফকিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ধামে আসছেন। তাঁর গুরু মুক্তিযোদ্ধা সোলেমান শাহ বেঁচে থাকতে নিয়মিত নৌকাযোগে এখানে আসতেন। গুরুর সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আজও ছেঁউড়িয়ায় ছুটে আসেন তিনি। তাঁর মতে, এখানে না এলে মন শান্ত হয় না। শুধু আবু বক্কর নন, শুক্রবার থেকেই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা সমবেত হতে শুরু করেছেন। চত্বরজুড়ে এখন একতারা আর ডুগির টুংটাং শব্দের সঙ্গে চলছে লালনের মরমি গান। আবু বক্করের কাছে ছেঁউড়িয়া কেবল একটি তীর্থস্থান নয়, দীর্ঘদিনের আত্মিক টান ও গুরুর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঠিকানা। সাধক ও ভক্তদের এই সমাবেশে একদিকে চলছে নিজস্ব রীতিতে সাধুসঙ্গ, অন্যদিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের আনাগোনায় মুখর আখড়াবাড়ির চারপাশ। সাধুসঙ্গ, গান ও মেলার মিলনে ছেঁউড়িয়া হয়ে উঠেছে মানুষের মিলনমেলা।

আখড়াবাড়ির মাঠে প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, লালন ফকিরের জীবনদর্শন শুধু দেশে নয়, বরং সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে তাঁর এই মরমি চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জায়েদ উর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে বলেন, বর্তমান সময়ের অশান্তি দূর করতে লালনের দর্শন অত্যন্ত জরুরি। তাঁর আদর্শকে পুঁজি করে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষণা ও চর্চা বাড়াতে হবে।

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ ও ফকিরানী আসমা খানম। আসমা খানম বলেন, মানুষই সব এবং মানুষকে ভালোবাসার মধ্যেই প্রকৃত মুক্তি নিহিত। অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন ও পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। মূল আলোচক হিসেবে ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রশিদুন নবী। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকবেন লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।

লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ মনে করেন, লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানবতাবাদী দর্শন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তাঁর দর্শন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভা শেষে প্রবীণ সাধু-ফকিররা মঞ্চে উদ্বোধনী গান ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ পরিবেশন করেন। এরপর রাতভর চলে গানের আসর, যেখানে ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ ও ‘জাত গেল জাত গেল বলে’র মতো কালজয়ী গানগুলো ধ্বনিত হয়। উল্লেখ্য, ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক এই ছেঁউড়িয়া গ্রামেই দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। সাধু-ফকিররা এখানে অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গে কাটাবেন, করবেন আত্মজিজ্ঞাসা, গানে গানে স্মরণ করবেন লালন সাঁইকে। মূল আখড়াবাড়ির ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাধু-ফকিররা নিজেদের মতো করে গুরুকার্যে ব্যস্ত।

আখড়াবাড়ির পাশের কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে বসেছে বিশাল মেলা। সেখানে অস্থায়ী দোকানগুলোতে কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন দর্শনার্থীরা। লালনের মানবতাবাদী চিন্তা ও মানুষকে ভালোবাসার বার্তা যেন ছেঁউড়িয়ার এই আয়োজনের প্রতিটি স্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরিতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। সেখানে অস্থায়ী দোকানে পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর