রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে লুকানো রয়েছে স্বর্ণখনি : যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা করছে

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২২৯ সময় দেখুন

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ইং (ঢাকা টিভি রিপোর্ট): আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত তুষারে ঢাকা বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে সামরিক পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু করায় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপায়েই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেই। বরং দ্বীপটি কেনার পথেই এগোতে চান তিনি। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারের এক প্রশ্নের জবাবে রুবিও এসব কথা বলেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে তথ্যটি প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পেছনে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। দ্বীপটির মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিরল খনিজ ভাণ্ডার। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও আধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যবহৃত নিওডাইমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখানে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। বর্তমানে এসব খনিজের বাজারে চীনের আধিপত্য থাকায়, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেই প্রভাব ভাঙতে চান ট্রাম্প।

 

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত। রাশিয়ার উত্তর উপকূলের নিকটবর্তী হওয়ায় এখান থেকে মস্কোর সামরিক তৎপরতা ও ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি নজরদারি করা সহজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন থুলে এয়ার বেস চালু রয়েছে, যা বর্তমানে রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। উত্তর মেরু অঞ্চলে নতুন নৌপথ চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার দূরত্ব ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা প্রায় সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের পথও উন্মুক্ত হচ্ছে।

 

এসব কারণে গ্রিনল্যান্ড এখন আর কেবল বরফে ঢাকা দ্বীপ নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের এক নতুন ‘স্বর্ণখনি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও দ্বীপটিতে বসবাসরত প্রায় ৫৭ হাজার আদিবাসী গ্রিনল্যান্ডকে বিক্রির পণ্য হিসেবে মানতে নারাজ, তবুও পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় শান্ত এই জনপদ ক্রমেই এক উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেও গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তার মতে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে এলে জাতীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।

 

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, গ্রিনল্যান্ড কেনা ট্রাম্পের জন্য একটি বড় লক্ষ্য, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব ঠেকাতে। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রধান হিসেবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে সবসময়ই থাকে।

 

এদিকে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশেরই আরেক সদস্য দেশকে হুমকি দেওয়া বা আক্রমণ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে সংঘাত হলে ন্যাটো জোট কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালায়, সেটিই হবে ন্যাটোর শেষ। ন্যাটোভুক্ত একটি দেশ অন্য সদস্য দেশকে আক্রমণ করলে পুরো জোটব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।

 

উল্লেখ্য, গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা বা আরও বেশি স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন আইসল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত গায়িকা বিয়র্ক। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, ১৯৪৪ সালে আইসল্যান্ড যেভাবে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, গ্রিনল্যান্ডও একদিন সেভাবেই স্বাধীন হতে পারবে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর