শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের সোনাজয় ও শিক্ষার হতাশাজনক বাস্তবতা

রিপোর্টার নাম
  • আপডেটের সময় : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ সময় দেখুন

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের (আইএমএসও) ২৩তম আসরে বাংলাদেশের খুদে শিক্ষার্থীরা দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। ১৩ বছরের কম বয়সী প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ১৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। সমাপনী অনুষ্ঠানে যখন বিজ্ঞানের স্বর্ণপদকের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির তাহমিদ হাসানের নাম ঘোষিত হয়, তখন পুরো দলের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আনন্দঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। ২০১৮ সালে রোমানিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে দেশের প্রথম স্বর্ণপদক জয়ের অভিজ্ঞতার মতোই এই অর্জনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ২০১৮ সালে রোমানিয়ায় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে দেশের প্রথম সোনার পদক জয়ের সময়েও উপস্থিত ছিলাম। তাহমিদ শুধু সোনার পদক জয় করেনি, পাশাপাশি সে তত্ত্বীয় অংশে সেরাদের সেরা শিক্ষার্থী হয়েছে। দলের অরিজিত সাহা মাত্র দুই নম্বরের জন্য স্বর্ণপদক পায়নি।

অনূর্ধ্ব-১৩ বছর বয়সীদের এই আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের এটিই প্রথম স্বর্ণপদক। আমাদের ১৬ জনের দলের ১৫ জনই পদক নিয়ে দেশে ফিরেছে, যার মধ্যে একটি সোনা, সাতটি রুপা এবং সাতটি ব্রোঞ্জ পদক রয়েছে। বিশেষ করে গণিত বিভাগে অংশ নেওয়া আটজনের প্রত্যেকেই পদক জয়ের গৌরব অর্জন করেছে। দলের সবচেয়ে ছোট দুজন সদস্য চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। এই খুদে মেধাবীদের প্রস্তুতি ও তাদের অদম্য পরিশ্রমের ফসল এই সাফল্য। তবে এই আনন্দের মধ্যেও দেশে ফেরার পথে আমার মনে বারংবার উদয় হয়েছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির কথা, যা অলিম্পিয়াডের সাফল্যের বিপরীতে এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক সংলাপ। গত মাসে প্রথম আলোতেই লিখেছিলাম, আমাদের জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের অনলাইন বাছাইয়ে কেউ কেউ ১৫টি প্রশ্নের উত্তর ১৫ মিনিটের কম সময়ে দিয়েছে, সম্ভবত প্রশ্নের ছবি তুলে এআইকে দিয়ে। আমাদের শিক্ষানীতি বহু বছর ধরে মাপা হয় উপকরণ দিয়ে: কটা স্কুলভবন উঠল, কত কোটি বই ছাপা হলো, কটা ট্যাব বিতরণ হলো।

গত মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বহু সূচক গুচ্ছ জরিপ (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৮ শতাংশই মৌলিক গাণিতিক দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ। আরও মনে পড়ে তার কয়েক দিন আগে প্রকাশিত একটি জাতীয় শিক্ষা জরিপের ফল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান মৌলিক দক্ষতা আর পাঠাভ্যাসের কথা তুলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেছিলেন শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা।

এছাড়া প্রায় ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু বয়স অনুযায়ী সহজ কোনো গল্প পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না।

যে বয়সের শিশু পশ্চিম জাভায় সোনা জিতে দেশকে গৌরবান্বিত করছে, সেই একই বয়সের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন শিক্ষার্থী দেশে সাধারণ অঙ্ক কষতে পারছে না।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ও বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় বছরের পর বছর একই চিত্র বারবার উঠে আসছে।

যদিও আমরা শিশুদের বিদ্যালয়ে আনা এবং ছেলেমেয়ের সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় অর্জন করেছি, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মানে এখনো পিছিয়ে আছি।

১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ওই আলোচনায় আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য নেওয়া ২৪টি প্রতিশ্রুতির একটিও এখনো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এমনকি ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অনুমোদনের মুখ দেখেনি। ১৯ সেপ্টেম্বর এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজন করেছিল ‘সরকার কতখানি এগোল। ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী। যে প্রযুক্তি নিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রে এখন শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে সাজানো হচ্ছে, পাঁচ ঘণ্টার একটি শিক্ষা-সংলাপে সেটি জায়গা পেল না।

সংলাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরে ফিরে এসেছে মিড-ডে মিলের দরপত্র, বিদ্যালয় নির্মাণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং প্রকল্পের কাঠামোগত জটিলতা। কিন্তু এসবের ভিড়ে মূল যে প্রশ্নটি ঢাকা পড়ে গেছে তা হলো—আমাদের শিশুরা কি প্রকৃতপক্ষে শিখছে? শিক্ষানীতির সাফল্য আমরা এখনো কেবল ভবন নির্মাণ, বই ছাপানো বা ট্যাব বিতরণের মতো অবকাঠামোগত উপকরণের ভিত্তিতে বিচার করছি। এসব কাজ সহজে গণনা করা যায় বা ছবি তুলে প্রচার চালানো যায়, কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণিতে কতটুকু শিখতে পেরেছে, তার দায়ভার নেওয়ার প্রবণতা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ যে কর্মসূচির মেয়াদ শুরু হয়ে গেছে, তার কাগজই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এরপর আলোচনা গড়াল দুর্গম এলাকায় দুপুরের খাবারের (মিড ডে মিল) দরপত্রে সরবরাহকারী না পাওয়া, প্রকল্পকাঠামোর জটিলতা, বিদ্যালয় নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাব, বরাদ্দের টাকা খরচ না হওয়া, শিক্ষকদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ—এসব বিষয়ে। ক্ষুধার্ত শিশু শিখতে পারে না, আর রাজনৈতিক প্রভাবে বানানো স্কুলভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ ছাড়া দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি কে হবেন তা নিয়ে। কেন্দ্রে ছিল প্রশাসন, প্রকল্প আর দরপত্র। এসব গোনা সহজ, ছবি তোলা সহজ, ফিতা কাটাও সহজ।

ইন্দোনেশিয়ার দলটি সম্পর্কে বলতে গেলে, স্বর্ণজয়ী তাহমিদ রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ে। তবে দলের আটজন গণিত শিক্ষার্থীর সবাই ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। এই শিশুদের কৃতিত্ব খাটো করার কোনো অবকাশ নেই, কারণ তারা কঠোর পরিশ্রম ও উপযুক্ত মেন্টরশিপের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন সুযোগ দেশের কত শতাংশ শিশু পায়? দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ভাগ্যে এই সুযোগ আদৌ জোটে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। প্রকৃত শিক্ষার মানদণ্ড মুষ্টিমেয় মেধাবী শিশু দিয়ে নয়, বরং লাখো সাধারণ শিক্ষার্থীর দক্ষতা দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত। অথচ আমরা প্রায় সব শিশুকে স্কুলে আনতে পেরেছি, ছেলেমেয়ের সমতাও এনেছি। কিন্তু কাউকে কখনো জবাব দিতে হয় না, এ বছর তৃতীয় শ্রেণির কত শতাংশ শিশু পড়তে শিখল।

অলিম্পিয়াড আন্দোলনের আড়াই দশকের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, শিশুরা আসলে কোথায় আটকে যায় বা কী বোঝে না। সরকারি পর্যায়ের শিক্ষা সংলাপগুলোতেও এই বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রথমত, শেখাকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রতিবছর উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত শিশুদের দক্ষতার ফল প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের কেবল প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের মেন্টর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে কেবল বিতরণের বস্তু হিসেবে না দেখে তাকে শেখার হাতিয়ার হিসেবে কার্যকর ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে হবে। আমি শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কিছু কথা বলতে চেয়ে সঞ্চালকের কাছে স্লিপ পাঠিয়েছি, যদিও সুযোগ পাইনি। এটা আমাকে যতটা না ব্যক্তিগতভাবে, তার চেয়ে বেশি ভাবিয়েছে আমাদের অগ্রাধিকার নিয়ে।

বর্তমানে চীন বা ভারতের মতো দেশগুলো এআই-কে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে সাজালেও, শিশুদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় এমন এআই ব্যবহারের চেয়ে ইঙ্গিত বা পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে সাহায্যকারী এআই টিউটর শিশুদের শেখার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। আমাদের মতো দেশে, যেখানে অনেক শিশুর পাশে সাহায্য করার মতো কেউ নেই, সেখানে সঠিকভাবে পরিচালিত এআই টিউটর বড় সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত, প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরের সংলাপে দুপুরের খাবারের দরপত্র নয়, বরং সেই ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর গাণিতিক দক্ষতার করুণ দশা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন। এটিই আমাদের সঠিক প্রশ্ন করার সক্ষমতা প্রমাণ করবে। অন্যদিকে উত্তর না দিয়ে ইঙ্গিত ও পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে সাহায্য করা এআই টিউটর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তেমন ক্ষতি দেখা যায়নি (আপনার বাচ্চাকে অঙ্কটার সঙ্গে একটু থাকতে দিন,, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর